দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানিসংকট ও লবণাক্ততা নিরসনে পদ্মা ব্যারাজ

তাহসান হোসেন

প্রকাশ:১৩:২১,২ নভেম্বর ২০২৬

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানিসংকট ও লবণাক্ততা নিরসনে পদ্মা ব্যারাজ

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানিসংকট, লবণাক্ততা, নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতা নিরসনে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চার বিভাগের ১৯টি জেলার প্রায় ৭ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবেন বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ, নৌ-চলাচল, পরিবেশ ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দাবি, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে মাছের উৎপাদন বছরে প্রায় আড়াই লাখ টন বাড়বে। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ৭ হাজার ১২৭ কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রকল্পটির সর্বশেষ অগ্রগতি জানিয়ে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেছেন, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের প্রস্তুতি অনেক আগেই শুরু হয়েছে। এ জন্য পানি ভবনে আলাদা অফিসও স্থাপন করা হয়েছে।

তিনি জানান, গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর পাংশার হাবাসপুরে এবং ২৫ অক্টোবর পাবনার সুজানগর উপজেলার সাতবাড়িয়া কাঞ্চনপার্ক এলাকায় প্রস্তাবিত প্রকল্পের স্থান পরিদর্শন করা হয়েছে। প্রকল্পের কার্যক্রম আরও গতিশীল হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী পদ্মা ব্যারাজের দৃশ্যমান কাজের উদ্বোধন করবেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে দেশের চার বিভাগের ১৯টি জেলার প্রায় ৭ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবেন। কৃষি ও অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তনের পাশাপাশি কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

তিনি আরও বলেন, পানিতে লবণাক্ততা বাড়তে থাকলে আগামী ২৫ থেকে ৩০ বছর পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক এলাকায় মানুষের বসবাস কঠিন হয়ে পড়তে পারে। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মাছসহ বিভিন্ন প্রাণীর অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়বে। পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসব সংকট মোকাবিলায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

গত ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ অনুমোদন করেছে। পুরো অর্থায়ন করা হবে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে। প্রকল্পের কাজ চলতি বছরের জুলাইয়ে শুরু হয়ে ২০৩৩ সালের জুনে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী ধাপে প্রকল্পের ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

পরিকল্পনা কমিশন জানায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতি রক্ষা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিসংকট দূর করা পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য। বর্ষা মৌসুমে পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে নিয়ন্ত্রিতভাবে সরবরাহ করা হবে এর মাধ্যমে।

প্রকল্পের মূল অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায়। ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল ব্যারাজের পাশাপাশি এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডারস্লুইস, দুটি ফিশ পাস, নৌ-লক, গাইড বাঁধ ও অ্যাপ্রোচ বাঁধ। ব্যারাজে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও রাখা হবে।

ফারাক্কার প্রভাবে সংকটে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল

একসময় প্রাণবন্ত থাকা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীগুলো দীর্ঘদিন ধরে পানির প্রবাহ সংকটে ভুগছে। ১৯৭০-এর দশকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের প্রভাব বাংলাদেশের পদ্মা নদীর প্রবাহেও পড়ে। এতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন নদীর পানিপ্রবাহ কমে যায়। হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতী ও বড়ালসহ অনেক নদী নাব্যতা হারিয়ে সংকটের মুখে পড়ে।

নদীতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি পলি জমা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও জলাবদ্ধতার সমস্যা প্রকট হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকট দেখা দেয়। কৃষকরা সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার পাশাপাশি আর্সেনিক দূষণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় মাছের উৎপাদন ও নৌ-চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। জীবিকা হারাচ্ছেন অনেক জেলে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, কৃষি উৎপাদন ও স্থানীয় অর্থনীতিতে।

এদিকে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সেচ সুবিধা পাবে প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমি

প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এর মাধ্যমে চলমান গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জি-কে) সেচ প্রকল্প এবং প্রস্তাবিত উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্পে পানির সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে। দক্ষিণ-পশ্চিম, মধ্য-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।

প্রকল্পের আওতায় খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা; ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ; রাজশাহী বিভাগের পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলায় কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী ব্যবস্থার পানিপ্রবাহ ও নাব্যতা পুনরুদ্ধার প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলের লবণাক্ততা কমানো এবং সুন্দরবনের জন্য মিঠাপানির সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

যশোরের ভবদহসহ বিভিন্ন এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃসঞ্চয়ন এবং আর্সেনিক দূষণ কমাতেও প্রকল্পটি ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

নদীভাঙন কমানোর সম্ভাবনা

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অংশে পদ্মা নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৪১ কিলোমিটার। গত দুই দশকে নদীভাঙনের কারণে পদ্মা তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় আনুমানিক ৮ থেকে ১০ হাজার হেক্টরের বেশি কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। প্রতিবছর গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার পরিবার সরাসরি নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত ড্রেজিং, তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ এবং নদীর প্রবাহ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে নদীভাঙনের হার ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হতে পারে।

বুয়েটের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে সুপেয় পানির সংকট রয়েছে। ভবিষ্যতে এ সংকট আরও বাড়ার পাশাপাশি সুন্দরবন ও আশপাশের অঞ্চলে লবণাক্ততার প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা রয়েছে। পলি জমার কারণে জলাবদ্ধতাও বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, এসব সমস্যা মোকাবিলায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মিঠাপানির সরবরাহ ও প্রবাহ বাড়ানো প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে পদ্মা ব্যারাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নদীব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হওয়ার পাশাপাশি পানি ও মাটির লবণাক্ততা কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি জমা, নদীভাঙন, উজানে নদীর ক্ষয় এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়গুলো সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করার পরামর্শ দিয়েছেন এ বিশেষজ্ঞ।

পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নে সরকারের প্রত্যাশা

সাংস্কৃতিক প্রতিমন্ত্রী এবং পদ্মা ব্যারাজ-দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটির সভাপতি আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম বলেন, পদ্মা ব্যারাজ জাতীয় জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প। ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে দেশের কৃষি, নৌ-চলাচল, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পদ্মা ব্যারাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি বলেন, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ প্রথমে নিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০০৪ সালের দিকে আবারও এ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তবে তখন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে এবং সে অনুযায়ী কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। প্রকল্পটি দৃশ্যমান হলে দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানিসংকট, লবণাক্ততা ও কৃষি সমস্যার সমাধানে নতুন সুযোগ তৈরি হবে। তবে প্রকল্পটির প্রত্যাশিত সুফল পেতে পানি সংরক্ষণ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন