মোঃ রফিক ইসলাম
প্রকাশ:১২:১১,২৮ অক্টোবর ২০২৬
দেশের বাজারে চার দফা কমার পর আবারও বেড়েছে স্বর্ণের দাম। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম সর্বোচ্চ ২ হাজার ২১৬ টাকা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। এতে ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৭৪ টাকা। বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল ১০টা থেকে নতুন এ দাম কার্যকর হয়েছে। স্থানীয় বাজারে তেজাবী স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্য সমন্বয়ের এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বাজুস। নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী, দেশের জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্ধারিত দামে স্বর্ণ বিক্রি করতে হবে। ফলে স্বর্ণালঙ্কার কিনতে ক্রেতাদের আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে।
বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণসংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে স্বর্ণের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে কমিটির চেয়ারম্যান ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে নতুন মূল্যতালিকা প্রকাশ করা হয়। এতে বিভিন্ন ক্যারেটের স্বর্ণের দাম পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজুস জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবী স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এ মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। এর আগে কয়েক দফায় স্বর্ণের দাম কমানো হলেও নতুন সিদ্ধান্তে আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে মূল্য।
বাজুসের নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী, ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৭৪ টাকা। ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৩ টাকা। এ ছাড়া ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ৯৫০ টাকা। আর সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৭৪ টাকা।
এক ভরি স্বর্ণের ওজন ১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম। নতুন নির্ধারিত এ মূল্য পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত দেশের সব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে কার্যকর থাকবে। তবে স্বর্ণালঙ্কার তৈরির নকশা, ডিজাইন ও কারিগরি কাজের ধরন অনুযায়ী মজুরির পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে। ফলে ক্রেতাদের অলঙ্কার কেনার ক্ষেত্রে স্বর্ণের নির্ধারিত মূল্যের পাশাপাশি প্রযোজ্য মজুরি ও অন্যান্য শর্ত বিবেচনায় নিতে হবে।
স্বর্ণের দাম বাড়ার ফলে বিয়ে, পারিবারিক অনুষ্ঠান এবং অন্যান্য উপলক্ষে স্বর্ণালঙ্কার কেনার পরিকল্পনা করা ক্রেতাদের ব্যয় বাড়তে পারে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণ কেনার জন্য সঞ্চয় করছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে নতুন মূল্যতালিকা বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, বাজারে স্বর্ণের দাম নিয়মিত পরিবর্তিত হওয়ায় ব্যবসায়ীদেরও নতুন মূল্যতালিকা অনুসরণ করে বেচাকেনা করতে হচ্ছে।
এর আগে গত ২৫ অক্টোবর দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম কমিয়েছিল বাজুস। সেদিন প্রতি ভরিতে ৩ হাজার ৩২৪ টাকা কমিয়ে ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা। একই সময়ে ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ২ লাখ ১০ হাজার ৯৪৩ টাকা, ১৮ ক্যারেটের দাম ১ লাখ ৮১ হাজার ২০০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম ছিল ১ লাখ ৪৮ হাজার ১৬ টাকা। ওই মূল্যতালিকা ২৫ অক্টোবর সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হয়েছিল।
সর্বশেষ সিদ্ধান্তে ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম আবারও বাড়িয়ে ২ লাখ ২৩ হাজার ৭৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ২৫ অক্টোবরের নির্ধারিত দামের তুলনায় বর্তমানে প্রতি ভরি ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম ২ হাজার ২১৬ টাকা বেশি। কয়েক দিনের ব্যবধানে দাম কমা ও বাড়ার এ প্রবণতা দেশের স্বর্ণবাজারে মূল্য পরিবর্তনের ধারাবাহিকতাকে সামনে এনেছে।
বাজুস জানিয়েছে, স্বর্ণালঙ্কার বিক্রির ক্ষেত্রে নকশা ও ডিজাইন অনুযায়ী মজুরি দিতে হবে। স্বর্ণ ও রুপার অলঙ্কারের বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত থাকায় ক্রেতার কাছ থেকে আলাদাভাবে ভ্যাট আদায় করা যাবে না। অর্থাৎ নির্ধারিত বিক্রয়মূল্যের বাইরে পুনরায় ভ্যাট নেওয়ার সুযোগ নেই।
অলঙ্কার বদল বা এক্সচেঞ্জের ক্ষেত্রে মজুরি ও পাথরের মূল্য বাদ দিয়ে নির্ধারিত মূল্যের ১২ শতাংশ কর্তন করতে হবে। অন্যদিকে, পুরোনো অলঙ্কার কিনে নেওয়া বা পারচেজের ক্ষেত্রে ১৮ শতাংশ বাদ দিতে হবে। তবে এক্সচেঞ্জ ও পারচেজের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে ভ্যাট বাদ দেওয়া যাবে না বলে জানিয়েছে বাজুস।
এসব নিয়মের কারণে পুরোনো স্বর্ণ বিক্রি কিংবা নতুন অলঙ্কারের সঙ্গে পুরোনো অলঙ্কার বদল করার সময় ক্রেতাদের হিসাব বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। অলঙ্কারের ওজন, স্বর্ণের ক্যারেট, পাথরের মূল্য, মজুরি এবং প্রযোজ্য কর্তনের হিসাব স্পষ্টভাবে জেনে লেনদেন করলে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের জন্যই স্বচ্ছতা বজায় রাখা সহজ হবে।
বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম মোট ১২৭ বার সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬১ বার দাম বাড়ানো হয়েছে, ৬৫ বার কমানো হয়েছে এবং একবার ভ্যাট সমন্বয় করা হয়েছে। অর্থাৎ চলতি বছরে স্বর্ণের বাজারে ঘন ঘন মূল্য পরিবর্তন হয়েছে। কখনো দাম বেড়েছে, আবার কখনো কমেছে।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালে স্বর্ণের দাম মোট ৯৩ বার সমন্বয় করা হয়েছিল। সে বছর ৬৪ বার দাম বাড়ানো হয় এবং ২৯ বার কমানো হয়েছিল। দুই বছরের মূল্য সমন্বয়ের পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, দেশের স্বর্ণবাজারে দাম পরিবর্তনের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। এ কারণে স্বর্ণ কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের সর্বশেষ মূল্যতালিকা সম্পর্কে অবগত থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
স্বর্ণের দাম নির্ধারণে স্থানীয় বাজারে তেজাবী স্বর্ণের মূল্যসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। বাজার পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে বাজুস নতুন করে মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তাই একবার নির্ধারিত দাম দীর্ঘ সময় অপরিবর্তিত থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
স্বর্ণের দাম বাড়লেও দেশের বাজারে রুপার দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। বাজুসের নির্ধারিত মূল্যতালিকা অনুযায়ী, ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম ৩ হাজার ৮৪৯ টাকা। ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম ৩ হাজার ৬৭৪ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম ৩ হাজার ১৪৯ টাকা। আর সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩৯১ টাকায়।
স্বর্ণ ও রুপার বাজারে দামের পরিবর্তন ক্রেতাদের কেনাকাটার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে স্বর্ণের দাম বাড়লে অনেকে বিকল্প হিসেবে রুপার অলঙ্কারের প্রতি আগ্রহী হতে পারেন। তবে রুপার দাম বর্তমানে অপরিবর্তিত থাকলেও ভবিষ্যতে বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী মূল্য সমন্বয় হতে পারে।
সব মিলিয়ে, চার দফা কমার পর স্বর্ণের দাম আবারও বাড়ায় দেশের স্বর্ণবাজারে নতুন মূল্যতালিকা কার্যকর হয়েছে। ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ২৩ হাজার ৭৪ টাকা হওয়ায় ক্রেতাদের এখন আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে। অন্যদিকে, ঘন ঘন মূল্য পরিবর্তনের কারণে স্বর্ণ কেনাবেচার আগে বাজুসের সর্বশেষ ঘোষিত দাম যাচাই করা এবং মজুরি ও অন্যান্য শর্ত জেনে নেওয়াই হবে ক্রেতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।