মোঃ আরাফাত আহমেদ
প্রকাশ:১৩:০৩,২৪ অক্টোবর ২০২৬
আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে দিনরাত কাজ করার জন্য দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনে নিজেদের ভুলত্রুটি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়েছে। সেসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়াতে হবে। একই সঙ্গে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জামায়াতের ঢাকা মহানগরী উত্তরের রুকন সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান। আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে নেতা-কর্মীদের সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদার, দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন এবং জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা থামব না, আমাদের থামার সুযোগ নেই। সামনে সিটি নির্বাচনে আমাদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ও দিনরাত এক করে কাজ করতে হবে। জাতীয় নির্বাচনের ভুলগুলো নিয়ে পর্যালোচনা হয়েছে। এবার এগুলোর আলোকে কাজ করলে আশা করি, আর ভুল হবে না।” তাঁর বক্তব্যে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় কার্যক্রম জোরদার এবং অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে জামায়াত আমির অভিযোগ করেন, জনগণ তাঁদের ভোট দিলেও তা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভোটাররা তাঁদের কাছে জানতে চান, ভোট দেওয়ার পরও তাঁরা সেই ভোট রক্ষা করতে পারেননি কেন। এ ধরনের প্রশ্নের মুখে নিজেদের দুর্বলতা স্বীকার করতে হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচনী অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে কোথায় ঘাটতি ছিল, তা চিহ্নিত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে এসব দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার ওপর জোর দেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, মানুষের ভালোবাসা ও সমর্থনের জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনে যেসব ভুলত্রুটি সামনে এসেছে, সেগুলো সংশোধন করে ভবিষ্যতের নির্বাচনে আরও সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সংগঠনের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হলে শুধু প্রত্যাশা করলেই চলবে না, দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও পরিশ্রম দেখাতে হবে।
আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে নেতা-কর্মীদের প্রস্তুতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যাঁদের প্রার্থী করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে আল্লাহর দেওয়া জ্ঞানের বড় নিয়ামত রয়েছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে প্রাচীর গড়ে তুলতে হবে। কোনো চোরকে আর ছাড় দেওয়া হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে নির্বাচনী কার্যক্রমের পাশাপাশি দুর্নীতি ও অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান উঠে আসে।
দেশ পরিচালনার দায়িত্ব কারা পাবেন, তা জনগণই নির্ধারণ করবেন উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, সমাজ পরিবর্তনের জন্য বসে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে হবে না। অন্যায় দেখলে সংগতভাবে প্রতিবাদ করতে হবে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আসন্ন নির্বাচনে সৎ, যোগ্য ও খোদাভীরু নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার জন্য রুকনদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
বক্তব্যে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নেতা-কর্মীদের ব্যক্তিগত জীবনাচরণ ও আত্মত্যাগের বিষয়েও আলোচনা করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, অতীতে সংগঠনের দায়িত্বশীলদের নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে কাজ করতে হয়েছে। বর্তমান সময়েও নেতা-কর্মীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পাশাপাশি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সংগঠনের দায়িত্ব পালনে আন্তরিকতা, শৃঙ্খলা ও ত্যাগের মানসিকতা ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অবদানের কথা উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যাঁরা দিন এনে দিন খান, তাঁদের আল্লাহর পথে অবদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজের চেয়ে জ্ঞান ও সম্পদে দুর্বল মানুষের অবস্থার কথা বিবেচনায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে তিনি মৃত্যু, পরকাল এবং নবী ইবরাহিম (আ.) ও নবী ইসমাইল (আ.)-এর ত্যাগের বিষয়েও আলোচনা করেন।
ঢাকা মহানগরী উত্তর ও দক্ষিণের সাংগঠনিক অবস্থার প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমির বলেন, একসময় দুই মহানগরীর অবস্থাই দুর্বল ছিল। নেতা-কর্মীদের ত্যাগ, কোরবানি ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে সংগঠন বর্তমান অবস্থানে এসেছে। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কিছুই সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি সব সময় তাঁর সাহায্য কামনা এবং সাংগঠনিক কাজে আন্তরিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, রুকনিয়াত কোনো পদ-পদবি নয়; এটি একটি মান। একে ক্ষমতা হিসেবে বিবেচনা করা ভুল হবে। রুকন হওয়ার সঙ্গে নীতি-নৈতিকতা বজায় রাখা এবং সাংগঠনিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত।
তিনি বলেন, রুকনদের মান ও আধ্যাত্মিকতা যত শক্তিশালী হবে, সংগঠনও তত শক্তিশালী হবে। আগামী মেয়র নির্বাচনে শক্তিশালী ভূমিকা রেখে ত্যাগ ও তিতিক্ষার প্রমাণ দিতে হবে। এর মাধ্যমে মেয়র ও কাউন্সিলর নির্বাচনে সফলতা অর্জন সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে সাংগঠনিক মানোন্নয়ন, নৈতিকতা এবং নির্বাচনী প্রস্তুতির বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, রুকন সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি সদস্যদের মান, শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতাও বাড়াতে হবে। শুধু সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি নয়, বরং আস্থাভাজন নেতৃত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। নেতা-কর্মীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বৃদ্ধির প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।
সম্মেলনটি দুটি পর্বে অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ৯টা ৪৫ মিনিট থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত চলে নির্বাচনী অধিবেশন। এ সময় ২০২৭-২০২৮ সেশনের জন্য ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির নির্বাচনে ভোট দেন রুকনরা। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ নির্বাচনে ১৩ হাজারের বেশি সদস্য ভোট দেন।
নির্বাচন পরিচালনা করেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসেন। তাঁকে সহযোগিতা করেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য আ. সবুর ফকির। নির্বাচনী অধিবেশন শেষে সকাল ১১টা থেকে শুরু হয় সাংগঠনিক অধিবেশন।
সাংগঠনিক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। অধিবেশন সঞ্চালনা করেন মহানগরীর সেক্রেটারি ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম। অনুষ্ঠানে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান এমপি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসেন ও নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপিসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য দেন।
সম্মেলনের একপর্যায়ে ঢাকা মহানগরী উত্তরের উদ্যোগে তৈরি ‘নাগরিক সেবা’ নামের একটি অ্যাপ উদ্বোধন করেন ডা. শফিকুর রহমান। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অ্যাপটিতে নাগরিকদের জন্য ৫০টিরও বেশি সেবামূলক সুবিধা রয়েছে। নাগরিকদের বিভিন্ন সেবা সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যে অ্যাপটি তৈরি করা হয়েছে বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
সামগ্রিকভাবে সম্মেলনে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় প্রস্তুতি জোরদার, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বৃদ্ধি এবং জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা, সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান জামায়াতের শীর্ষ নেতারা। পাশাপাশি রুকনদের নৈতিকতা, ত্যাগ ও দায়িত্বশীলতার মান উন্নয়নের মাধ্যমে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।