আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ:১২:৪১,২৯ অক্টোবর ২০২৬
বরগুনার আমতলী উপজেলায় ভারপ্রাপ্ত এক প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ করেছেন বিদ্যালয়ের কর্মরত শিক্ষক, কর্মচারী ও স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে পটুয়াখালীর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কার্যালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীদের পক্ষে মো. নাসির উদ্দীন এবং স্থানীয় আবদুল বাতেন দেওয়ান, মো. নুরুজ্জামান শিকদার ও মো. নজরুল ইসলাম।
২৬ দফা অভিযোগে তাঁরা অর্থ আত্মসাতের সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানিয়েছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সরকারি অনুদানের পাঁচ লাখ টাকা ব্যয়ের অর্ধেক টাকা কোনো শিক্ষক বা কর্মচারীকে না জানিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
বিদ্যালয়ে সব ধরনের রেজিস্ট্রেশন ও ফরম পূরণে বোর্ড নির্ধারিত ফির চেয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়। অতিরিক্ত আদায় করা টাকা বিদ্যালয়ের তহবিলে জমা না করে তিনি ব্যক্তিগতভাবে আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অষ্টম শ্রেণির রেজিস্ট্রেশন ফি বোর্ড নির্ধারিত ফির চেয়ে তিন গুণ বেশি, অর্থাৎ জনপ্রতি ৩০০ টাকা করে মোট ৩০ হাজার টাকা আদায় করেন। পরবর্তীতে বোর্ড নির্ধারিত ওই রেজিস্ট্রেশন বাতিল করলেও তিনি অদ্যাবধি শিক্ষার্থীদের টাকা ফেরত দেননি এবং বিদ্যালয়ের তহবিলেও জমা করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৬ সালের অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার ফরম পূরণের জন্য বোর্ড নির্ধারিত ফি ছিল ৪০০ টাকা এবং প্রবেশপত্র ফি ছিল ২০০ টাকা। প্রবেশপত্র বিতরণের সময় অতিরিক্ত ২০০ টাকা নেওয়ার কথা থাকলেও তিনি ২১ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে এককালীন ১ হাজার টাকা করে মোট ২১ হাজার টাকা আদায় করেন। কোনো শিক্ষক-কর্মচারীর সঙ্গে আলোচনা না করে এবং বিদ্যালয়ের তহবিলে জমা না দিয়ে তিনি সম্পূর্ণ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সরকারি নিয়মানুযায়ী বিদ্যালয়ের সব ব্যাংক হিসাব প্রধান শিক্ষক ও সভাপতি অথবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)-এর যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত হওয়ার কথা থাকলেও তিনি তা না করে তাঁর পছন্দের একজন শিক্ষককে নিয়ে হিসাব পরিচালনা করছেন এবং ইচ্ছামতো টাকা তুলে আত্মসাৎ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
টিউশন ফির টাকা শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে সঠিকভাবে বণ্টন না করে বিগত দুই বছর ধরে তিনি টালবাহানা করছেন। এ ছাড়া বিগত বছরে সাবেক সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে ৯০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা উত্তোলন করে বিদ্যালয়ের তহবিলে ৯০ হাজার টাকা জমা দিয়ে বাকি ৩০ হাজার টাকা নিজের পকেটে ঢোকানোর অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে গচ্ছিত ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে ১ লাখ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করার অভিযোগও রয়েছে।
সাবেক সভাপতি ২ লাখ টাকা প্রদান করে দাতা সদস্য হয়েছিলেন। সেই টাকা আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে।
নিয়মবহির্ভূতভাবে ফরম পূরণের সময় প্রবেশপত্র, মার্কশিট ও সনদপত্রের জন্য ফি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি নিয়ম লঙ্ঘন করে বিদ্যালয় চলাকালীন কোচিং করানো এবং অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার কোচিংয়ের নামে আলাদা টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের ছুটির আগে বা পরে পড়ানোর নিয়ম থাকলেও ভালো শিক্ষার্থীদেরও বাধ্য করে প্রতি বিষয়ে ১ হাজার টাকা হারে কোচিং করানো হচ্ছে। কোচিংয়ের আয়ের ১০ শতাংশ বিদ্যালয়ের তহবিলে জমা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিজে না পড়িয়ে মাসিক ৫ হাজার টাকা করে নিজের পকেটে ভরছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্যালয়ের বিভিন্ন আসবাবপত্র, যেমন—বেঞ্চ, প্রিন্টারসহ অন্যান্য সরঞ্জাম তিনি নিজের বাসায় নিয়ে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০২৫ সালে দুদকের পটুয়াখালী কার্যালয় থেকে বিদ্যালয়ের ‘সততা স্টোর’-এর জন্য দেওয়া ২৫ হাজার টাকা শিক্ষক-কর্মচারীদের না জানিয়ে তিনি সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিগত দিনে তিনি দুটি পকেট কমিটি গঠন করেছিলেন, যা নিয়ে মামলা চলমান ছিল। বর্তমানে অ্যাডহক কমিটির অভিভাবক সদস্য নির্বাচনের জন্য অভিভাবক সমাবেশ না করে নিজের পছন্দের লোকজন নিয়ে মনগড়া পকেট কমিটি গঠনের অভিযোগ উঠেছে।
ভুয়া ভাউচার তৈরি ও একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ ছাড়া গাইড প্রকাশনীর কাছ থেকে অনৈতিক কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
তিনি নিজে কোচিং করানোর কারণে এবং প্রশ্নপত্র তাঁর কাছে সংরক্ষিত থাকায় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগও উঠেছে। শিক্ষকদের হয়রানি করার একাধিক অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। বিদ্যালয়ের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কেনার ক্ষেত্রেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে।
শিক্ষকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক ফাঁকা রেজুলেশন বইয়ে স্বাক্ষর নেওয়া এবং আট থেকে ১০টি রেজুলেশন বই বেআইনিভাবে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে।
সরকারি নিয়মে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা হাতে রাখার বিধান থাকলেও তিনি লক্ষাধিক টাকা হাতে রেখে আত্মসাৎ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভর্তি নীতিমালায় ৫০০ টাকা নির্ধারিত থাকলেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। মোট কত টাকা আদায় হয়েছে, তার কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা নিয়ে বাসায় বসে ভর্তি করানো হয়। এ ছাড়া বাছাই পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়, যা বিদ্যালয়ের তহবিলে জমা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিজের দুর্নীতি আড়াল করতে তিনি সাবেক সভাপতি ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের স্বাক্ষর জাল করে একাধিক রেজুলেশন ও ভাউচার তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০২১ সালের কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নিজের আপন ভাইকে দিয়ে হাইকোর্টে মামলা করিয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত কমিটি বহাল রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া এনটিআরসিএ (NTRCA) আয়োজিত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েও হাইকোর্টে মামলা করে প্রধান শিক্ষকের পদটি স্থগিত করে রেখেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রতি বছর সরকার গাছ লাগানোর জন্য ৫ হাজার টাকা দিলেও গাছ না লাগিয়ে ওই টাকা সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া প্রতি বছর ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থীর নিজ নাম, পিতার নাম বা মাতার নামে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করে পরে তা সংশোধনের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে ওই বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শাহীন মাহমুদ তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন।
আমতলী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. টিপু সুলতান জানান, অভিযোগের কপি পেয়েছি। তদন্তের মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মো. হাফিজুর রহমান বলেন, “দুদকে অভিযোগ করা হয়েছে। এর একটি অভিযোগপত্র পেয়েছি। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”