আরিয়ান আহমেদ
প্রকাশ:১২:৩৭,২ নভেম্বর ২০২৬
দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশা ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) আওতাধীন সড়ক নেটওয়ার্কের ২ হাজার ২৩০ কিলোমিটারের বেশি এখন ভাঙাচোরা অবস্থায় রয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে সংস্থাটির সড়ক নেটওয়ার্কে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের হার বেড়েছে ২ শতাংশেরও বেশি। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জরিপে সওজের মোট সড়কের ১০ দশমিক ৫৫ শতাংশকে দুর্বল, খারাপ ও খুব খারাপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অথচ এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সড়কের অবস্থার উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগামী পাঁচ অর্থবছরে ১৭ হাজার ৬৫২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সওজ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থের প্রয়োজন চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই।
সওজ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে সংস্থাটির আওতাধীন মোট সড়ক নেটওয়ার্কের দৈর্ঘ্য ২১ হাজার ১৩০ দশমিক ২৯ কিলোমিটার। এর মধ্যে ২ হাজার ২৩০ কিলোমিটার সড়ক ভাঙাচোরা অবস্থায় রয়েছে। ফলে এসব সড়কে যানবাহন চলাচলে বাড়ছে ভোগান্তি, যাতায়াতে ব্যয় হচ্ছে অতিরিক্ত সময় ও জ্বালানি। পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বাড়ছে। বিশেষ করে জেলা সড়কগুলোর অবস্থা সবচেয়ে বেশি নাজুক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে সাধারণ যাত্রী, পরিবহন মালিক ও ব্যবসায়ীদের প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
সওজের সড়ক নেটওয়ার্কের মান নির্ধারণে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করে জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। শ্রেণিগুলো হলো ভালো, চলনসই, দুর্বল, খারাপ ও খুব খারাপ। এর মধ্যে শেষের তিন শ্রেণির সড়ককে ভাঙাচোরা বা ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে সড়কের মান উন্নয়নের ধারায় ছেদ পড়েছে। কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের হার কমলেও সর্বশেষ অর্থবছরে তা আবার বেড়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সওজের মোট সড়ক নেটওয়ার্কের ৩৭ দশমিক ৩৪ শতাংশই ভাঙাচোরা অবস্থায় ছিল। পরবর্তী সময়ে নিয়মিত সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রমের ফলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা কমে ২৪ দশমিক ৩৪ শতাংশে নেমে আসে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের হার ছিল ১৬ দশমিক ২৬ শতাংশ। এরপর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ হার সামান্য কমে ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ হয়। কিন্তু সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জরিপে তা বেড়ে ১০ দশমিক ৫৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ আগের কয়েক বছরের উন্নতির পর আবারও সড়কের মান অবনতির প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
জেলা সড়কের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ
সওজের সড়ক নেটওয়ার্কের ধরন অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে জেলা সড়ক। সংস্থাটির আওতাধীন মোট ১১ হাজার ৭৭৯ দশমিক ২০ কিলোমিটার জেলা সড়কের মধ্যে ১ হাজার ৪৪৩ দশমিক ৪৩ কিলোমিটার ভাঙাচোরা। অর্থাৎ মোট ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের বড় অংশই জেলা সড়ক। অন্যদিকে ৪ হাজার ৩০১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়কের মধ্যে ৩৯৫ দশমিক ২০ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া ৫ হাজার ৪৯ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়কের মধ্যে ভাঙাচোরা ৩৯১ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার।
জেলা সড়কের এমন পরিস্থিতি স্থানীয় পর্যায়ে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করে তুলছে। এসব সড়ক দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াতের পাশাপাশি কৃষিপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও বিভিন্ন পণ্য পরিবহন করা হয়। ফলে জেলা সড়কগুলোর দুরবস্থা শুধু যাত্রী ভোগান্তিই বাড়াচ্ছে না, স্থানীয় অর্থনীতি ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সবচেয়ে নাজুক চট্টগ্রাম অঞ্চল
অঞ্চলভিত্তিক জরিপে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি পাওয়া গেছে চট্টগ্রাম জোনে। এ অঞ্চলের মোট ২ হাজার ৭৩ দশমিক ৯১ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৪৪৫ দশমিক ৩২ কিলোমিটারই ভাঙাচোরা। অর্থাৎ চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রতি পাঁচ কিলোমিটার সড়কের এক কিলোমিটারেরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ এবং সড়কের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতা এ ধরনের ক্ষতির পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে প্রকৃত কারণ নির্ধারণে এলাকাভিত্তিক কারিগরি পরীক্ষা ও মূল্যায়ন প্রয়োজন।
চট্টগ্রামের পর ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের হারের দিক থেকে কুমিল্লা জোনের অবস্থান। এ অঞ্চলে ভাঙাচোরা সড়কের হার ১২ দশমিক ৮৮ শতাংশ। খুলনা জোনে এ হার ১০ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং সিলেট জোনে ১০ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অন্যদিকে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে রংপুর জোন। এ অঞ্চলের ২ হাজার ১৭ দশমিক ৮৮ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ১১৮ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত। শতকরা হিসাবে যার পরিমাণ ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ। অঞ্চলভেদে সড়কের মানের এমন পার্থক্য অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার কার্যক্রমে এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
পাঁচ বছরে মেরামতে প্রয়োজন ১৭ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা
সড়কের ভাঙাচোরা অংশ মেরামত ও সংস্কারের জন্য আগামী পাঁচ অর্থবছরে মোট ১৭ হাজার ৬৫২ কোটি ৭৯ লাখ টাকার চাহিদা জানিয়েছে সওজ। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই সবচেয়ে বেশি অর্থের প্রয়োজন হবে। এ বছর সড়ক মেরামতে ৮ হাজার ৮২৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে। পরবর্তী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রয়োজন হবে ৩ হাজার ৪১১ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
এছাড়া ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ২ হাজার ৬৭৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ১ হাজার ৫৯৪ কোটি ২১ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ১ হাজার ১৪৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ প্রথম দুই অর্থবছরেই মোট চাহিদার বড় অংশ ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই বিপুল অর্থ বরাদ্দ ও যথাযথভাবে ব্যয় করা না গেলে সড়কের বর্তমান পরিস্থিতির উন্নতি কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
শুধু মেরামত নয়, প্রয়োজন প্রতিরোধমূলক রক্ষণাবেক্ষণ
যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রকৃত কারণ শনাক্ত না করে বারবার মেরামত করলে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান হবে না। অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, ভারী পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল, জলাবদ্ধতা কিংবা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতা—কোন কারণে কোন সড়ক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে হবে। কারণভেদে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে মেরামতের পর অল্প সময়ের মধ্যেই আবার সড়ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে সড়কের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষা শুরুর অন্তত দুই মাস আগে সড়কের পাশের নালা-নর্দমা ও পানি নিষ্কাশনের পথ পরিষ্কার করতে হবে। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতাপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে সেখানে দ্রুত পানি অপসারণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। কোথাও পানি জমে থাকলে তা দ্রুত সরানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এসব উদ্যোগকে প্রতিরোধমূলক রক্ষণাবেক্ষণ বলা হয়।
তাদের মতে, প্রতি বর্ষা মৌসুমের পর সড়ক মেরামতে ৪ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। অথচ নিয়মিত ও আগাম রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এই ব্যয়ের বড় একটি অংশ সাশ্রয় করা সম্ভব। সড়ক নির্মাণের পর নির্দিষ্ট সময় পরপর পরীক্ষা, ছোটখাটো ক্ষতি দ্রুত মেরামত এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল রাখার মাধ্যমে বড় ধরনের ক্ষতি প্রতিরোধ করা যায়। এতে একদিকে সড়কের স্থায়িত্ব বাড়বে, অন্যদিকে সরকারের বিপুল অর্থের অপচয়ও কমবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না; অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কোন সড়ক কখন মেরামত করা হয়েছে, কাজের মান কেমন ছিল এবং মেরামতের পর কতদিন সড়কটি ভালো অবস্থায় রয়েছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
বরাদ্দের অর্থ পুরোপুরি ব্যয় করতে পারেনি সওজ
এদিকে সড়কের মান অবনতির বিষয়ে সওজের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বরাদ্দের পুরো অর্থ ব্যয় করতে পারেনি সংস্থাটি। ওই অর্থবছরে সরকার পরিবর্তনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে উন্নয়ন ও সংস্কার কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল। ফলে বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও অনেক কাজ যথাসময়ে শুরু করা সম্ভব হয়নি।
তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সওজের বরাদ্দ ছিল ২৬০ কোটি টাকা। কিন্তু এর বিপরীতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১০৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দের উল্লেখযোগ্য অংশ অব্যবহৃত থেকে যায়। ওই অর্থবছরে যেসব সড়ক মেরামতের পরিকল্পনা ছিল, তার অনেক কাজ পরবর্তী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসে শুরু হয়েছে। বর্তমানে এসব কাজ চলমান রয়েছে।
প্রধান প্রকৌশলী আশা প্রকাশ করেন, চলমান সংস্কার ও মেরামত কার্যক্রম শেষ হলে আগামী বছর সড়কের পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, চলমান প্রকল্পগুলোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার এবং কাজের মান নিশ্চিত করা না গেলে সড়কের স্থায়ী উন্নয়ন কঠিন হবে।
সার্বিকভাবে সওজের সড়ক নেটওয়ার্কে ভাঙাচোরা অংশের হার আবার বেড়ে যাওয়া দেশের যোগাযোগ অবকাঠামোর জন্য উদ্বেগজনক সংকেত। বিশেষ করে জেলা সড়কগুলোর দুরবস্থা এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের নাজুক পরিস্থিতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। পাঁচ বছরে সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দের পরিকল্পনা থাকলেও শুধু অর্থ ব্যয় নয়, সড়কের ক্ষতির কারণ চিহ্নিত করে পরিকল্পিত সংস্কার, প্রতিরোধমূলক রক্ষণাবেক্ষণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।