জমির মালিকানা বিরোধে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা নয়: হাইকোর্ট

মোঃ রফিক ইসলাম

প্রকাশ:২০:০০,২১ অক্টোবর ২০২৬

জমির মালিকানা বিরোধে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা নয়: হাইকোর্ট

ছবি: সংগৃহীত

জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলেই সংশ্লিষ্ট জমির ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যাবে না। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা পেতে হলে আবেদনকারীকে নিজের মালিকানা দাবির পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রাথমিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। শুধু জমির দখলে থাকার দাবি, দলিলের উল্লেখ কিংবা নামজারির তথ্য তুলে ধরলেই আদালতের কাছ থেকে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা পাওয়া যাবে না। জমির মালিকানা-সংক্রান্ত একটি মামলার রায়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের ঘটনায় করা একটি সিভিল রিভিশন আবেদনের শুনানি শেষে এ সিদ্ধান্ত দেন হাইকোর্টের বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খানের একক বেঞ্চ। গত ১০ সেপ্টেম্বর রায়টি দেওয়া হয়। পরে ১৮ অক্টোবর রায়টি প্রকাশ করা হয়।

রায়ে আদালত স্পষ্ট করেন, অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকারীর দাবির পক্ষে প্রাথমিকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে মূল মামলাটি আইন অনুযায়ী দায়ের ও পরিচালনা করা সম্ভব কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। অর্থাৎ, জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলেই এক পক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া সমীচীন নয়; বরং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও আইনি অবস্থান পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

১৯৪৪ সালের দলিলের ভিত্তিতে মালিকানা দাবি

মামলার বাদী মো. ইসহাক আলী (মৃত) ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের দাবি, ১৯৪৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি একটি দলিলের মাধ্যমে তাঁরা বিরোধপূর্ণ জমি কিনেছিলেন। এরপর থেকে জমিটি তাঁদের ভোগদখলে ছিল বলে দাবি করেন তাঁরা।

বাদীপক্ষের অভিযোগ, জমির খতিয়ানে ভুলভাবে অন্য ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁদের দাবি, ১৯৭৭ সালে দায়ের করা একটি স্বত্ব মামলায় রায় ও ডিক্রি পাওয়ার ভিত্তিতেও বিরোধপূর্ণ জমির ওপর তাঁদের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে তাঁদের নামজারি বাতিল করে জমিটি অন্যদের কাছে ইজারা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন বাদীপক্ষ। এতে জমিটির ওপর নিজেদের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থেকে তাঁরা আদালতের শরণাপন্ন হন। মূল মামলার পাশাপাশি জমির ওপর নিজেদের দাবি সুরক্ষিত রাখতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞাও চান তাঁরা।

বাদীপক্ষের বক্তব্য ছিল, দীর্ঘদিনের মালিকানা দাবি, জমি কেনার দলিল এবং আগের স্বত্ব মামলার রায় ও ডিক্রির ভিত্তিতে বিরোধপূর্ণ জমির ওপর তাঁদের অধিকার রয়েছে। এ অবস্থায় জমিটি নিয়ে পরবর্তী কোনো কার্যক্রম বন্ধ রাখতে আদালতের অন্তর্বর্তী সুরক্ষা প্রয়োজন।

সরকারি পক্ষের আপত্তি, জমি অর্পিত সম্পত্তি কি না

অন্যদিকে, সরকারি পক্ষ জমিটিকে অর্পিত সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত বলে দাবি করে। একই সঙ্গে জমির মালিকানা প্রমাণে বাদীপক্ষের উপস্থাপিত দলিল এবং ১৯৭৭ সালের স্বত্ব মামলার রায় ও ডিক্রির সত্যতা নিয়েও আপত্তি তোলে তারা।

এতে জমিটির প্রকৃত মালিকানা, সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের গ্রহণযোগ্যতা এবং অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে এর আইনি অবস্থান নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। ফলে শুধু বাদীপক্ষের দাবি বা জমির দখলের বক্তব্যের ভিত্তিতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা যাবে কি না, তা আদালতের বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আবেদন

মামলার নথি অনুযায়ী, প্রথমে বিচারিক আদালত বিরোধপূর্ণ জমির ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন। পরে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। এরপর অতিরিক্ত জেলা জজ মামলাটি ফেরত পাঠিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন।

এর মধ্যে ছিল, জমিটি অর্পিত সম্পত্তির আওতাভুক্ত কি না এবং এ অবস্থায় মূল মামলাটি আইন অনুযায়ী চলতে পারে কি না, তা যাচাই করা। নিম্ন আদালতের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন করেন বাদীপক্ষ।

হাইকোর্টে আবেদনের শুনানির সময় জমির মালিকানা দাবির পক্ষে উপস্থাপিত দলিল, আগের মামলার রায় ও ডিক্রি এবং নামজারি-সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। এসব নথির গ্রহণযোগ্যতা ও প্রমাণগত ভিত্তি যাচাই করেই আদালত অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেন।

অনিবন্ধিত দলিল ও রায়-ডিক্রির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন

নথিপত্র পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট দেখতে পান, বাদীপক্ষের মালিকানা দাবির অন্যতম ভিত্তি ১৯৪৪ সালের একটি অনিবন্ধিত দলিল। এ ছাড়া ১৯৭৭ সালের স্বত্ব মামলার রায় ও ডিক্রির সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, সংশ্লিষ্ট মামলার রেজিস্টারের সঙ্গে আদালতে উপস্থাপিত রায় ও ডিক্রির সত্যায়িত অনুলিপির মিল পাওয়া যায়নি। ফলে আগের মামলার রায় ও ডিক্রিকে মালিকানা দাবির নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সংশয় তৈরি হয়।

এ ছাড়া বাদীপক্ষ জমির নামজারি সংশোধন এবং সংশোধিত এসএ খতিয়ানের কথা উল্লেখ করলেও সংশ্লিষ্ট খতিয়ান কিংবা নামজারির নথি আদালতে জমা দিতে পারেননি। জমির মালিকানা দাবির পক্ষে এসব নথির গুরুত্ব থাকায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উপস্থাপন করতে না পারার বিষয়টিও আদালতের বিবেচনায় আসে।

এসব পরিস্থিতিতে জমিটির ওপর বাদীপক্ষের মালিকানা দাবির পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে মনে করেন হাইকোর্ট। আদালতের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট হয়, শুধু দলিল থাকার দাবি বা পূর্ববর্তী কোনো মামলায় রায় পাওয়ার কথা উল্লেখ করলেই হবে না; সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের সত্যতা ও গ্রহণযোগ্যতাও প্রমাণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আগে প্রাথমিক প্রমাণ যাচাই জরুরি

রায়ে হাইকোর্ট বলেন, অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আগে বাদীর দাবির পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে মূল মামলাটি আইন অনুযায়ী দায়ের করা যায় কি না, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।

আদালত অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন, ২০০১-এর ৭ ও ১৩ ধারাও আলোচনা করেন। তবে মূল মামলার প্রয়োজনীয় আরজি হাইকোর্টে উপস্থাপন করা হয়নি। এ কারণে মূল মামলাটি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি আদালত।

অর্থাৎ, আদালত মূল মামলার সব আইনি প্রশ্নের নিষ্পত্তি না করলেও অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার জন্য বাদীপক্ষের উপস্থাপিত প্রাথমিক প্রমাণ যথেষ্ট কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। মালিকানা দাবির পক্ষে প্রয়োজনীয় নথিপত্রের ঘাটতি এবং উপস্থাপিত রায় ও ডিক্রির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় নিষেধাজ্ঞার আবেদন গ্রহণের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

সিভিল রিভিশনের রুল খারিজ, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির নির্দেশ

বাদীপক্ষ জমির মালিকানা দাবির পক্ষে যথেষ্ট প্রাথমিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি এবং নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার মতো কোনো আইনগত ভুলও পাওয়া যায়নি বলে রায়ে উল্লেখ করেন হাইকোর্ট। পরে সিভিল রিভিশনের রুল খারিজ করে আগের অন্তর্বর্তী আদেশ প্রত্যাহার করেন আদালত।

একই সঙ্গে মামলাটি তখনও নিষ্পত্তি না হয়ে থাকলে অপ্রয়োজনীয় সময়ক্ষেপণ না করে যত দ্রুত সম্ভব তা নিষ্পত্তির জন্য নিম্ন আদালতকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

এই রায়ের মধ্য দিয়ে জমির মালিকানা-সংক্রান্ত বিরোধে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চাওয়ার ক্ষেত্রে প্রাথমিক প্রমাণের গুরুত্ব আবারও উঠে এসেছে। জমির দখল, দলিল বা নামজারির দাবি উল্লেখ করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের গ্রহণযোগ্যতা ও সত্যতা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। তবে এ মামলায় মূল বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি; আদালত মূলত অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা এবং নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তের বৈধতা বিবেচনা করেছেন।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন