নাফিস আহমেদ
প্রকাশ:১৩:১৩,১ নভেম্বর ২০২৬
দেশের বিচার অঙ্গনে বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর একাধিক হত্যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। এর মধ্যে রয়েছে নারায়ণগঞ্জের সাত খুন, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ, পুরান ঢাকার দরজি দোকানি বিশ্বজিৎ দাস এবং সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলা।
এসব মামলার আপিল দ্রুত শুনানির জন্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে উপস্থাপন করেছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। ইতোমধ্যে মামলাগুলোর শুনানির জন্য পৃথক তারিখও নির্ধারণ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের এ উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার শেষ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হলে বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের করা আপিল শুনানির জন্য আগামী ১৭ নভেম্বর দিন ধার্য করেছেন আপিল বিভাগ। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পর গত ১৮ অক্টোবর বিচারপতি মো. রেজাউল হকের চেম্বার আদালত এ তারিখ নির্ধারণ করেন।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনকে অপহরণ করা হয়। অপহরণের ঘটনা দেখে ফেলায় আইনজীবী চন্দন সরকার ও তাঁর গাড়িচালক মো. ইব্রাহিমকেও অপহরণ করা হয়।
তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীতে ছয়জনের মরদেহ ভেসে ওঠে। পরদিন উদ্ধার করা হয় আরও একজনের মরদেহ।
২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালত এ মামলায় র্যাব-১১-এর সাবেক তিন কর্মকর্তা লে. কর্নেল তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ হোসেন, কমান্ডার এম এম রানাসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন।
পরবর্তী সময়ে হাইকোর্ট ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং ১১ জনের দণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। বাকি ৯ জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডও বহাল থাকে।
বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের করা আপিল শুনানির জন্য আগামী ২৪ নভেম্বর দিন ধার্য করা হয়েছে।
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা সবাই বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ছিলেন।
২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এ মামলার রায়ে ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্টও ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন। এখন উচ্চ আদালতে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে মামলাটি।
সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের করা আপিল শুনানির জন্য আগামী ১ ডিসেম্বর দিন ধার্য করা হয়েছে।
২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর পুলিশ চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর সিনহা।
২০২১ সালের ৩১ জানুয়ারি বিচারিক আদালত এ মামলায় দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড, ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সাতজনকে খালাস দেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেন টেকনাফ থানার বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ এবং শামলাপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের বরখাস্ত পরিদর্শক লিয়াকত আলী। ২০২৫ সালের ২ জুন হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন।
পুরান ঢাকার দরজি দোকানি বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল ও রাষ্ট্রপক্ষের লিভ টু আপিল শুনানির জন্য আগামী ৮ ডিসেম্বর দিন ধার্য করা হয়েছে।
২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর বিরোধী দলের অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে বিশ্বজিৎ দাসকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪ এ মামলায় ২১ আসামির মধ্যে আটজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
২০১৭ সালের ৬ আগস্ট হাইকোর্ট আটজনের মধ্যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। চারজনের মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন এবং দুজনকে খালাস দেওয়া হয়। এ ছাড়া যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত ১৩ জনের মধ্যে দুজন আপিল করে খালাস পান।
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত শেষ করে আগামী বছরের ২৯ এপ্রিল অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই দিন মামলার নথিপত্রসহ উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্সের প্রধান এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহাকে আদালতে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, বর্তমান সরকার কাউকে রক্ষা করা বা তথ্য গোপন করতে চায় না। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা ও দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর ও রুনি। দীর্ঘদিন তদন্তের দায়িত্ব বিভিন্ন সংস্থার হাতে থাকলেও মামলাটির তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
এদিকে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় প্রায় ১০ বছর পর একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার হাফিজুর রহমান সেনাবাহিনীর সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন তনু। পরে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের অদূরে একটি ঝোপ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। বর্তমানে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তাধীন রয়েছে।
গত ২১ এপ্রিল ঢাকার কেরানীগঞ্জের নিজ বাসা থেকে হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি ২০২৩ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। তনু হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন।
এ ছাড়া মামলার দুই অভিযুক্ত অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য মো. জাহিদুজ্জামান ও মো. শাহীন আলমের বিরুদ্ধে গত ১ সেপ্টেম্বর ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করেছে।
আলোচিত এসব মামলার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বাসসকে বলেন, সমাজ ও সাধারণ মানুষের বিবেককে নাড়া দেওয়া এসব মামলা দ্রুত এবং চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তির জন্য রাষ্ট্রপক্ষ উদ্যোগ নিয়েছে। আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত মামলাগুলো নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্ধারিত তারিখে শুনানি শুরু হয়ে মামলাগুলোর দ্রুত চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে।
রাষ্ট্রপক্ষের এই উদ্যোগের ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিচারিক প্রক্রিয়ায় থাকা আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পথ তৈরি হয়েছে। তবে এসব মামলায় আপিল শুনানি ও আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পরই বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।