মিরপুর, আশুলিয়া ও গাজীপুরে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ

জাওয়াদ হোসেন

প্রকাশ:১২:৫৫,২ নভেম্বর ২০২৬

মিরপুর, আশুলিয়া ও গাজীপুরে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ

রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন। বিভিন্ন দাবিতে সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল থেকে রাজধানীর মিরপুর, সাভারের আশুলিয়া এবং গাজীপুরের কালিয়াকৈর এলাকায় সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। এ সময় আশুলিয়া ও মিরপুরে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং পুলিশি টিয়ারশেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশে যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ, বিজিবিসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে আশপাশের বেশ কয়েকটি শিল্পকারখানাও বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।

সোমবার সকাল থেকেই বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার পল্লীবিদ্যুৎ ও মৌচাক এলাকায় শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে সকাল সোয়া ৯টার দিকে রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকায় শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে সকাল ১০টার পর সাভারের আশুলিয়ার নরসিংহপুর ও নিশ্চিন্তপুর এলাকায় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়।

আশুলিয়ায় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ

সাভারের আশুলিয়ায় সকাল ১০টার পর থেকে আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের নরসিংহপুর ও নিশ্চিন্তপুর এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের উত্তেজনা ও সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকালে বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা প্রথমে অনন্ত কারখানার সামনে জড়ো হন। পরে তারা হামীম কারখানার সামনে গিয়ে অবস্থান নেন। এ সময় আন্দোলনরত শ্রমিকদের পক্ষ থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।

একপর্যায়ে বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিকরা সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে তাদের উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। এ সময় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং যানবাহন চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে।

সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ঘটনাস্থলে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। শ্রমিক ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মুখোমুখি অবস্থানে ছিলেন। তবে এ সংঘর্ষে তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে শিল্প পুলিশ-১-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপারেশনস অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স) শোয়েব আহম্মেদ জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

মিরপুর-১০-এ শ্রমিকদের সরিয়ে দিল পুলিশ

এদিকে রাজধানীর মিরপুরেও সকাল থেকে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা দেখা দেয়। সকাল সোয়া ৯টার দিকে মিরপুর-১০ এলাকায় শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশ তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। একপর্যায়ে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হলে পুলিশ পাল্টা টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে।

পুলিশের টিয়ারশেল নিক্ষেপের পর আন্দোলনরত শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। এতে ওই এলাকায় সাময়িক উত্তেজনা ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। তবে পুলিশি তৎপরতায় শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।

মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, শ্রমিকরা রাস্তা অবরোধ করতে এসেছিলেন। পুলিশ তাদের সরিয়ে দিয়েছে।

গাজীপুরে ১০ কিলোমিটার মহাসড়ক বন্ধ

অন্যদিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় শ্রমিক বিক্ষোভের কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার পল্লীবিদ্যুৎ ও মৌচাক এলাকায় শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে আন্দোলনের প্রভাব আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মৌচাক, পল্লীবিদ্যুৎ, সফিপুর ও হরিণহাটিসহ আশপাশের এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়কজুড়ে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় ওই পথে চলাচলকারী যাত্রী ও পরিবহন চালকদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়।

পরিস্থিতির কারণে মহাসড়কের আশপাশের শিল্পকারখানাগুলো বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। শ্রমিক অসন্তোষ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।

কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম জানান, সকালে শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘটনাস্থলে বিজিবি, পুলিশসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছেন।

একযোগে তিন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভে উদ্বেগ

একই দিনে রাজধানীর মিরপুর, আশুলিয়া ও গাজীপুরের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বিক্ষোভ এবং কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে আশুলিয়া ও গাজীপুর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পোশাকশিল্প অঞ্চল হওয়ায় এসব এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাব শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ও সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় পড়ছে।

আশুলিয়ার আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়ক এবং গাজীপুরের ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক, পণ্য পরিবহন ও সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব সড়কে শ্রমিকদের অবস্থান ও অবরোধের কারণে কারখানার শ্রমিকদের যাতায়াতের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনেও বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।

সার্বিক পরিস্থিতিতে তিনটি এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। তবে শ্রমিকদের আন্দোলনের মূল কারণ ও দাবিগুলোর বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। পাশাপাশি আন্দোলন কখন স্বাভাবিক হবে এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো কবে উৎপাদনে ফিরবে, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

শ্রমিক অসন্তোষের কারণে শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ, উৎপাদন কার্যক্রম ও সড়ক যোগাযোগ যাতে দীর্ঘ সময় ব্যাহত না হয়, সেজন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় জরুরি হয়ে উঠেছে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন