আনন্দ প্রতিদিন ডেস্ক
প্রকাশ:১৬:০১,৩১ অক্টোবর ২০২৬
দেশের টেলিভিশন নাটকের নির্মাণপ্রক্রিয়া এবং অভিনয়শিল্পী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্মাতাদের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ছোটপর্দার অভিনেত্রী পারসা ইভানা। তাঁর অভিযোগ, অনেক সময় নাটকের চরিত্রের জন্য উপযুক্ত অভিনয়শিল্পী নির্বাচন করলেও নায়ক কিংবা প্রযোজকের পছন্দ ও চাপে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হন পরিচালকরা। এমনকি চূড়ান্ত হওয়ার পরও শেষ মুহূর্তে বদলে দেওয়া হয় অভিনয়শিল্পীদের তালিকা। এতে নাটকের মূল পরিকল্পনা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি গল্প ও চরিত্রের যথাযথ উপস্থাপনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন এই অভিনেত্রী।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে দেশের নাটকের নির্মাণপ্রক্রিয়া, অভিনয়ের মান এবং কাস্টিং নিয়ে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করেন পারসা ইভানা। তাঁর মতে, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে টেলিভিশন নাটক নিয়ে যেভাবে বিস্তারিত আলোচনা ও সমালোচনা হয়, বাংলাদেশে তেমন চর্চা নেই। সেখানে অভিনয়শিল্পীদের অভিনয়, উচ্চারণ, পরিচালকের কাজ কিংবা চিত্রনাট্যের দুর্বলতা—সবকিছু নিয়েই খোলামেলা বিশ্লেষণ করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে এ ধরনের গঠনমূলক সমালোচনা তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়।
পোস্টে পারসা উল্লেখ করেন, আশপাশের দেশগুলোতে একটি নাটক প্রচারের পর কে কেমন অভিনয় করেছেন, কার উচ্চারণে ভুল রয়েছে, পরিচালনায় কোথায় ঘাটতি ছিল কিংবা লেখক গল্পের মাধ্যমে কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এসব আলোচনা নাটকের মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক সময় অভিনেতার ভুল উচ্চারণ কিংবা অভিনয়ের দুর্বলতা চোখে পড়লেও তা সংশোধনের যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হয় না। ফলে একই ধরনের সমস্যা বারবার থেকে যাচ্ছে।
নাটকের কাস্টিং প্রক্রিয়া নিয়ে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে এই অভিনেত্রী বলেন, একটি নাটকের চরিত্রের জন্য উপযুক্ত অভিনয়শিল্পী নির্বাচন করা নির্মাণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু লেখক, পরিচালক ও প্রযোজকের পছন্দ যখন এক জায়গায় মেলে না, তখন মূল পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে অনেক ক্ষেত্রে নায়ক কিংবা প্রযোজকের পছন্দকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে পরিচালকের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়। এমনকি শুটিংয়ের আগে চূড়ান্ত হওয়া কাস্টিংও শেষ মুহূর্তে বদলে যায় বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
পারসার মতে, নাটকের অভিনয়শিল্পী নির্বাচন হওয়া উচিত গল্প ও চরিত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী। কোনো অভিনয়শিল্পী ব্যক্তিগতভাবে জনপ্রিয় কিংবা প্রযোজকের পছন্দের হলেই তাঁকে নির্দিষ্ট চরিত্রে নিতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত নয়। বরং চরিত্রের সঙ্গে কার অভিনয়, অভিব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব সবচেয়ে বেশি মানানসই, সেটিই বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও চাপের কারণে ভুল কাস্টিং হলে ভালো গল্পও পর্দায় প্রত্যাশিতভাবে ফুটে ওঠে না।
অভিনয়শিল্পীদের দায়িত্ব সম্পর্কেও নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন পারসা ইভানা। তাঁর মতে, একজন অভিনেতার প্রধান কাজ হলো চরিত্রটি যথাযথভাবে উপলব্ধি করা এবং নিজের অভিনয়ের মাধ্যমে সেটিকে জীবন্ত করে তোলা। একইভাবে পরিচালক, লেখক ও প্রযোজকেরও উচিত নিজেদের ব্যক্তিগত সুবিধার ঊর্ধ্বে উঠে নির্মাণের মানকে গুরুত্ব দেওয়া। তা না হলে অনেক সম্ভাবনাময় গল্প ও ভালো চিত্রনাট্যও যথাযথভাবে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে না।
তিনি আরও মনে করেন, নাটক বড় পর্দার জন্য নির্মিত হোক কিংবা ছোট পর্দার জন্য, শেষ পর্যন্ত দর্শকের সামনে কাজের মানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই নির্মাণের প্রতিটি পর্যায়ে পেশাদারত্ব, পারস্পরিক সম্মান এবং সৃজনশীল সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে কাস্টিংয়ের ক্ষেত্রে পরিচালকের পরিকল্পনা ও চরিত্রের চাহিদাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
পারসা ইভানার এই বক্তব্য প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে আলোচনা। অনেকেই তাঁর পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। তাঁদের মতে, নাটকের মান উন্নত করতে হলে অভিনয়শিল্পী নির্বাচন থেকে শুরু করে চিত্রনাট্য, পরিচালনা ও অভিনয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে পেশাদারত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। তবে অভিনেত্রীর এমন মন্তব্যের পেছনে নির্দিষ্ট কোনো সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
উল্লেখ্য, শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী হিসেবে প্রথমে পরিচিতি পান পারসা ইভানা। পরবর্তী সময়ে অভিনয়ে যুক্ত হয়ে ছোটপর্দায় নিজের অবস্থান তৈরি করেন তিনি। ২০১৫ সালে অভিনয়জগতে যাত্রা শুরু করেন এই অভিনেত্রী। এরপর ২০১৮ সাল থেকে টেলিভিশন নাটকে নিয়মিত কাজ করছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি নাটকের নির্মাণপ্রক্রিয়া ও শিল্পীদের পেশাগত পরিবেশ নিয়ে তাঁর এই বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সব মিলিয়ে দেশের নাট্যাঙ্গনে কাস্টিংয়ের স্বাধীনতা, নির্মাতাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং গঠনমূলক সমালোচনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে পারসা ইভানার মন্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। নাটকের মানোন্নয়নে ব্যক্তিগত পছন্দের পরিবর্তে গল্প ও চরিত্রের প্রয়োজনকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, এখন সেই আলোচনাই সামনে এসেছে।