আদিব খান
প্রকাশ:১৩:৪৫,৩১ অক্টোবর ২০২৬
হাজারো মানুষের রক্তের বিনিময়ে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান হলেও দেশে নতুন স্বৈরাচারের উত্থান ঘটছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, পতিত স্বৈরাচার ও নব্য স্বৈরাচার—দুই শক্তিকেই পরাজিত করা হবে। সরকারের ব্যর্থতার দায় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ও জ্বালানিমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। অন্যথায় আন্দোলনের কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করা হবে।
শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে চার দফা দাবিতে আয়োজিত গণবিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। জনগণের নিরাপত্তা দিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এ ব্যর্থতার দায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওপর সবচেয়ে বেশি বর্তায়। অথচ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে তিনি সংবিধান সংশোধনের কাজে ব্যস্ত রয়েছেন।
সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও জুলাই সনদের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি উপেক্ষা করে একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করা হয়েছে। অবিলম্বে এ কমিটি বাতিল করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে।
বিএনপির সমালোচনা করে এনসিপির আহ্বায়ক অভিযোগ করেন, নির্বাচনী ইশতেহার, ৩১ দফা ও জুলাই সনদে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যাচ্ছে দলটি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেশ পরিচালনার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, সরকার দুর্নীতি, লুটপাট, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব প্রতিষ্ঠার পথে এগোচ্ছে।
ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের ফিরে আসার প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকার আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করতে পারবে না। এ পরিস্থিতিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শক্তি ও তরুণদের আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন তিনি। নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র চলছে। সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা, পাহাড়ে অশান্তি এবং ভারতের বিভিন্ন স্থানে মুসলমানদের নিপীড়নের বিষয়গুলো তুলে ধরে তিনি সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনা করেন।
বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতকে করিডর দেওয়ার বিরোধিতা করে তিনি বলেন, কোনো অবৈধ করিডর বাংলাদেশের জনগণ মেনে নেবে না। আগামী ডিসেম্বরে গঙ্গা চুক্তি ন্যায্যভাবে নবায়ন না হলে জনগণ আবারও আন্দোলনে নামবে।
আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও বক্তব্য দেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি জানান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং উত্তরে আসিফ মাহমুদ নির্বাচনে অংশ নেবেন। তাঁদের বিজয়ী করতে এনসিপি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের নেতাকর্মীরা মাঠে থাকবেন। সন্ত্রাস ও দখলদারত্ব থেকে মানুষকে মুক্ত করতে এনসিপি কাজ করবে বলেও জানান তিনি।
সমাবেশে এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, নির্বাচনের পর দেশ ঠিক হওয়া তো দূরের কথা, বিএনপি নিজেরাই ঠিক হয়নি। গ্যাসের দাম নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, কলকাতায় এক হাজার টাকায় গ্যাস পাওয়া গেলে বাংলাদেশে কেন আড়াই হাজার টাকা দিতে হবে?
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে সমালোচনা করে আখতার হোসেন বলেন, বাজেটের সময় সাধারণত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে। বিএনপি সরকার দাবি করেছে, বাজেটের সময় কোনো পণ্যের দাম বাড়েনি। কিন্তু বাস্তবে বাজেটের আগে, পরে এবং এখনো প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়তির দিকে রয়েছে।
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, নতুন বাংলাদেশ গঠনের জন্য দলের আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব নিরলসভাবে কাজ করছেন। জনগণের দুঃখ-দুর্দশা দূর করে নতুন বাংলাদেশ গড়াই তাঁদের লক্ষ্য। ঢাকাকে নতুন করে গড়ে তোলার আন্দোলন শাহবাগ থেকে শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে এ গণবিক্ষোভ দেশের প্রতিটি শহর ও অলিগলিতে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে শপথ নেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন করতে হবে। গণঅভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের হত্যার বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ওসমান হাদির হত্যার বিচারও বাংলাদেশে নিশ্চিত করতে হবে।
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এনসিপি ক্ষমতায় যাওয়ার উপযুক্ত হবে। সমাবেশে উপস্থিত মানুষের সংখ্যা আগামী দিনে দ্বিগুণ, পাঁচ গুণ, এমনকি ১০ গুণ হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
শাহবাগের এ গণবিক্ষোভ সমাবেশে এনসিপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা অংশ নেন। বক্তারা সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করে দাবি বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলন আরও জোরদার করার হুঁশিয়ারি দেন।