দেশে লক্ষাধিক শিক্ষক পদ শূন্য, ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম

তাসনিম হোসেন

প্রকাশ:১৪:১৮,৩১ অক্টোবর ২০২৬

দেশে লক্ষাধিক শিক্ষক পদ শূন্য, ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম

দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে শিক্ষক সংকট। প্রাথমিক থেকে শুরু করে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—প্রায় প্রতিটি স্তরেই বিপুলসংখ্যক শিক্ষক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে রয়েছে। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত পাঠদান, ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিখন কার্যক্রম। কোথাও প্রধান শিক্ষক নেই, কোথাও বিজ্ঞান, গণিত ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের শিক্ষক সংকট রয়েছে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক কম থাকায় কর্মরত শিক্ষকদের অতিরিক্ত ক্লাস নিতে হচ্ছে। এতে একদিকে শিক্ষকদের ওপর বাড়ছে কাজের চাপ, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত পাঠদান ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সব মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। শিক্ষক সংকটের এমন পরিস্থিতিতে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাস পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের শিখন ঘাটতি, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে তাদের পরবর্তী শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ কর্মদক্ষতার ওপর।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন না হওয়া, অবসরজনিত কারণে পদ খালি হওয়া এবং প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থী না পাওয়াসহ নানা কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক সংকট বাড়ছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি ব্যবহারিক ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা গ্রহণও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট এতটাই তীব্র যে, একটি বিষয়ের শিক্ষককে একাধিক শ্রেণিতে পাঠদান করতে হচ্ছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে একজন শিক্ষককে একাধিক বিষয়ের ক্লাসও নিতে হচ্ছে। এতে পাঠদানের মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নতুন ভবন নির্মাণ কিংবা আধুনিক শিক্ষা উপকরণ সরবরাহের পাশাপাশি পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকটের চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেশজুড়ে ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুমোদিত শিক্ষক পদের সংখ্যা ৪ লাখ ২৯ হাজার ৫৩১টি। কিন্তু গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব পদে কর্মরত ছিলেন পৌনে চার লাখের মতো শিক্ষক। ফলে তখন প্রায় ৫৬ হাজার শিক্ষক পদ শূন্য ছিল। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ ছিল ৩৬ হাজার ২৩৫টি এবং সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ ছিল প্রায় ২০ হাজার। সম্প্রতি ১৪ হাজার সহকারী শিক্ষক যোগদান করায় শূন্য পদের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। তারপরও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ৪৩ হাজার শিক্ষকের পদ এখনো শূন্য রয়েছে। বিশেষ করে বিপুলসংখ্যক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা, শিক্ষকদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন, পাঠদান তদারকি এবং শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে নিয়মিত প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি পাঠদান সামলাতে গিয়ে শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।

শুধু প্রাথমিক বিদ্যালয় নয়, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষক সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দেশের ৬৯৩টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৮৩টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। পাশাপাশি সহকারী প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের পদেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে সহকারী প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের মোট অনুমোদিত পদ ছিল ১৬ হাজার ৬০১টি। এর বিপরীতে কর্মরত ছিলেন ১৩ হাজার ১৯২ জন। ফলে শূন্য ছিল ৩ হাজার ৪০৯টি পদ। দীর্ঘদিন ধরে এসব পদ পূরণ না হওয়ায় বিদ্যালয়গুলোর নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো বিষয়গুলোতে প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকলে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচি যথাসময়ে শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিদ্যমান শিক্ষকদের দিয়ে অতিরিক্ত ক্লাস পরিচালনা করলেও সব বিষয়ে সমান গুরুত্ব দিয়ে পাঠদান নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক সংকটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে অসংখ্য শিক্ষক পদ খালি থাকলেও প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) বিশেষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ফলাফলেই এর ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে ৬৭ হাজার ৮৭টি শূন্য পদের বিপরীতে মাত্র ১৮ হাজার ৩৯৯টি আবেদন জমা পড়ে। আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে ১১ হাজার ৭১৩ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক পদ পূরণ করা সম্ভব হয়নি। হিসাব অনুযায়ী, ওই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় ৫৫ হাজার ৪৯৫টি পদ শূন্য থেকে যায়। পরবর্তী সময়ে নতুন করে আরও কিছু পদ খালি হওয়ায় বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক সংকটের পরিমাণ আরও বেড়েছে। সব মিলিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৬০ হাজার শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা।

এনটিআরসিএর ওই বিশেষ নিয়োগ কার্যক্রমে দেশের ১৯ হাজার ২০৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মোট ৬৭ হাজার ১৩০টি পদের চাহিদা পাঠানো হয়েছিল। যাচাই-বাছাই শেষে ৬৭ হাজার ৮৭টি পদের বিপরীতে আবেদন গ্রহণ করা হয়। কিন্তু চাহিদার তুলনায় যোগ্য প্রার্থীর সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম। অনেক শূন্য পদের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষক নিবন্ধন সনদধারী কোনো প্রার্থী পাওয়া যায়নি। ফলে সেসব পদে নিয়োগের জন্য কাউকে সুপারিশ করা সম্ভব হয়নি। এতে একদিকে যেমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক সংকট থেকেই গেছে, অন্যদিকে নিয়োগের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় পদগুলো পূরণ করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক তৈরির ক্ষেত্রে পরিকল্পনার ঘাটতি, প্রত্যন্ত অঞ্চলে চাকরির অনাগ্রহ এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এ সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েও শিক্ষক সংকটের চিত্র স্বস্তিদায়ক নয়। দেশের পুরনো সরকারি ও জাতীয়করণ করা ৬৫৩টি কলেজে প্রায় পৌনে চার হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে পুরনো সরকারি কলেজগুলোতে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত প্রভাষকের শূন্য পদের সংখ্যা ৬৫৬টি। অন্যদিকে সরকারি ও সদ্য জাতীয়করণ করা কলেজগুলোতে প্রভাষক পর্যায়ে আরও তিন হাজারের বেশি পদ খালি রয়েছে। এসব কলেজে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার্থী থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাস ও পাঠ্যসূচি সম্পন্ন করা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকলে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অর্জনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অনেক কলেজে সীমিতসংখ্যক শিক্ষক দিয়ে একাধিক শ্রেণি ও বিভাগের পাঠদান পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে শিক্ষকরা প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারছেন না এবং শিক্ষার্থীরাও কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা সহায়তা পাচ্ছে না।

কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক সংকটের প্রভাব আরও ব্যাপক। কারণ সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষায় ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং হাতে-কলমে কাজ শেখার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পর্যাপ্ত শিক্ষক ও প্রশিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বর্তমানে দেশের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুমোদিত ১৫ হাজার ৮৪৪টি শিক্ষক পদের মধ্যে ৮ হাজার ৪৮৬টি পদ শূন্য রয়েছে। অর্থাৎ অনুমোদিত পদের অর্ধেকেরও বেশি পদে শিক্ষক নেই। এসব শূন্য পদের মধ্যে দুই হাজার ২০৪টি পদে নিয়োগের সুপারিশ চেয়ে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) কাছে চাহিদা পাঠানো হয়েছে। তবে বাকি পদগুলো পূরণে কার্যকর উদ্যোগ কত দ্রুত নেওয়া হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষক ও প্রশিক্ষকের ঘাটতির কারণে শিক্ষার্থীরা আধুনিক প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি পরিচালনা, শিল্পকারখানার কাজের পরিবেশ এবং বাস্তব কর্মক্ষেত্রের উপযোগী দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে। ফলে কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা সম্প্রসারণের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নেও বাধা তৈরি হচ্ছে।

শিক্ষক সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের শিখন অর্জনের ওপর। একটি শিক্ষাবর্ষে নির্ধারিত পাঠ্যসূচি সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক থাকা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু শিক্ষক না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট বিষয়ের ক্লাস নিয়মিত হচ্ছে না। কোথাও সপ্তাহে কয়েকটি ক্লাস হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না। আবার কোথাও একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণির দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগতভাবে শেখার সুযোগ কমে যাচ্ছে। দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদা করে বুঝিয়ে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময়ও শিক্ষকরা পাচ্ছেন না। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার ভিত্তি গড়ে ওঠার সময় শিক্ষক সংকট তৈরি হলে পরবর্তী শ্রেণিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের আরও বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এর প্রভাব পড়ে পরীক্ষার ফলাফল, উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি এবং বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে। কারিগরি পর্যায়ে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি থাকলে শিক্ষার্থীরা সনদ অর্জন করলেও কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিয়ে প্রবেশ করতে পারে না।

এদিকে সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শূন্য পদ পূরণে কিছু উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের প্রায় দুই হাজার শূন্য পদ পূরণের জন্য সরকারি কর্ম কমিশনের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের ৩৬ হাজার ২৩৫টি শূন্য পদ পূরণের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। এসব পদে কর্মরত সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতি দেওয়া হলে প্রধান শিক্ষকের সংকট কিছুটা কমতে পারে। তবে এর ফলে সহকারী শিক্ষকের পদগুলোও নতুন করে শূন্য হবে। তখন ওই পদগুলো পূরণে নতুন করে নিয়োগের প্রয়োজন দেখা দেবে। অর্থাৎ শুধু পদোন্নতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক সংকট সমাধান করা সম্ভব হলেও সামগ্রিক শিক্ষক সংকট নিরসনে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের বিকল্প থাকবে না। এ কারণে পদোন্নতি ও সরাসরি নিয়োগ—দুই প্রক্রিয়াই সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলোর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় শিক্ষক সংকট নিরসনে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে সব শূন্য পদ পূরণে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ার বিষয়টি নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি করেছে। শুধু নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলেই শিক্ষক সংকট দূর হবে না; কোন বিষয়ে কতজন শিক্ষক প্রয়োজন, কোথায় শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছে না এবং কেন প্রার্থীরা নির্দিষ্ট পদে আবেদন করছেন না—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে বিশেষ প্রণোদনা, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক তৈরির উদ্যোগ এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানান, বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার এবং সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শূন্য পদ পূরণের জন্য মাউশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারি কর্ম কমিশনে নিয়মিত চাহিদা পাঠায়। পাশাপাশি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক পদ পূরণেও মন্ত্রণালয়ের বিশেষ উদ্যোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এমন উদ্যোগের কথা জানানো হলেও বিপুলসংখ্যক শূন্য পদ দ্রুত পূরণ না হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমে সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, একটি দেশের শিক্ষার মান নির্ভর করে দক্ষ শিক্ষক, মানসম্মত পাঠদান এবং কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থাপনার ওপর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকলে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা আধুনিক শিক্ষা উপকরণ সরবরাহের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন সম্ভব নয়। তাই শিক্ষক সংকটকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে না দেখে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংকট হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। দ্রুত শূন্য পদ পূরণ, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, যোগ্য প্রার্থী তৈরির পরিকল্পনা এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা দূর করার মাধ্যমে এ সংকট মোকাবিলা করতে হবে। অন্যথায় লাখ লাখ শিক্ষার্থী নিয়মিত পাঠদান ও মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে। বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষক ঘাটতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যৎ দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক মান রক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি কমাতে এখনই কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন