আয়াশ খান
প্রকাশ:১২:৪৪,১ নভেম্বর ২০২৬
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের নির্ধারিত তিনটি সূচকেই মানদণ্ডের চেয়ে এগিয়ে থাকার পরও বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ানোকে ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ: জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ও আমাদের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকগুলো শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও রাজনৈতিক পরিবর্তন, অর্থনীতির দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলার সক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়গুলো উত্তরণের সময় বাড়ানোর আবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি জানান, এলডিসি উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা—এই তিনটি সূচকেই নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করেছে। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এসব সূচকে বাংলাদেশের ধারাবাহিক অগ্রগতি হয়েছে।
সিপিডির এই ফেলো বলেন, মাথাপিছু জাতীয় আয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নির্ধারিত মানদণ্ডের চেয়ে প্রায় ১৬ শতাংশ, মানবসম্পদ সূচকে ১৭ শতাংশ এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচকে প্রায় ৩২ শতাংশ ভালো অবস্থানে ছিল। জাতিসংঘের ৪৪টি স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে বাংলাদেশকে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জনকারী অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ পরপর দুটি মূল্যায়নে অর্থাৎ ছয় বছর ধরে উত্তরণের মানদণ্ড পূরণ করলে এলডিসি তালিকা থেকে বের হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে। সে অনুযায়ী বাংলাদেশের ২০২৪ সালেই উত্তরণের কথা ছিল। তবে কোভিড পরিস্থিতির কারণে প্রস্তুতির সময় বাড়িয়ে ২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়।
উত্তরণের সময় আরও তিন বছর বাড়ানোর বিষয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে চিঠি দিয়ে অতিরিক্ত তিন বছর সময় চান। সব সূচকে মানদণ্ড পূরণ করার পরও বাংলাদেশকে এ সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপালও অতিরিক্ত সময় চেয়েছিল এবং উভয় দেশই এ সুযোগ পেয়েছে।
রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, সিডিপির নিয়মে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন সরাসরি উত্তরণের সময় বাড়ানোর কারণ হিসেবে বিবেচিত হয় না। তবে গণতান্ত্রিক উত্তরণের সময়ে অর্থনীতিতে সৃষ্ট জটিলতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এসব কারণে অর্থনীতি কিছুটা দুর্বল হয়েছে এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাও কমেছে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজে জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে চিঠি দিয়ে সময় চাওয়ায় বিষয়টি কেবল আমলাতান্ত্রিক বা কারিগরি প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর মাধ্যমে সরকার উত্তরণ প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক দায়িত্ব ও মালিকানা গ্রহণ করেছে।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের আবেদনের প্রতি বিভিন্ন দেশের অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং ওইসিডিভুক্ত দেশগুলো বাংলাদেশের আবেদনের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিল। অন্যদিকে, ভেটো ক্ষমতাধর কয়েকটি বড় দেশ এ উদ্যোগের পক্ষে তেমন অবস্থান নেয়নি। এ ছাড়া নিম্ন-মধ্যম আয়ের কিছু দেশ ও বাংলাদেশের প্রতিযোগী কয়েকটি দেশ একটি সফল অর্থনীতিকে অতিরিক্ত সময় দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নেয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ এবং অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খানসহ প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।