বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ:১৬:২০,২১ অক্টোবর ২০২৬
ফাইল ছবি
রাস্তার পাশের পিঠা, পুরি-পেঁয়াজুর দোকান থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টির দোকান, ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান ও খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান—নির্ধারিত শ্রেণির সব খাদ্য ব্যবসাকে নিবন্ধনের আওতায় আনছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। আগামী ১ নভেম্বর থেকে এসব খাদ্য ব্যবসার নিবন্ধন ও লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা যাবে। নতুন বিধান অনুযায়ী, যেসব ব্যবসার নিবন্ধন বা লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক, সেগুলো প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া পরিচালনা করলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, আমদানি ও বিপণন কার্যক্রমে শৃঙ্খলা আনা এবং ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
বুধবার বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নতুন এই ব্যবস্থার কথা জানানো হয়। গত ১৬ জুলাই সরকারি গেজেটে প্রকাশিত ‘নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬’-এ খাদ্য ব্যবসার নিবন্ধন ও লাইসেন্সসংক্রান্ত বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নতুন প্রবিধানমালায় খাদ্য ব্যবসার নিবন্ধন, ব্যবসায়িক লাইসেন্স, স্থাপনার লাইসেন্স, খাদ্য উৎপাদন ও আমদানির লাইসেন্স এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত পণ্যের নিবন্ধনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর ফলে নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের ব্যবসার ধরন অনুযায়ী নিবন্ধন বা প্রয়োজনীয় লাইসেন্স নিতে হবে।
নিবন্ধনের আওতায় আসবে ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা
নতুন প্রবিধানমালা অনুযায়ী, নির্ধারিত ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা ও স্থাপনাকে নিবন্ধন করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফলের রস বিক্রির দোকান, পেস্ট্রি শপ, ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান, প্যাকেটজাত খাবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এবং নির্ধারিত খাদ্যপণ্যের আমদানিকারক। এ ছাড়া পাইকারি মুদি ব্যবসা, খাদ্য সংরক্ষণাগার, কোল্ড স্টোরেজ এবং ভোজ্যতেল ও ভোজ্য লবণ উৎপাদনসংশ্লিষ্ট নির্ধারিত ব্যবসাও নিবন্ধনের আওতায় থাকবে।
এ উদ্যোগের আওতায় আসবে রাস্তার পাশের পিঠা, পুরি ও পেঁয়াজু বিক্রির দোকানও। অর্থাৎ, শুধু বড় রেস্তোরাঁ কিংবা শিল্পকারখানায় উৎপাদিত খাবার নয়, নির্ধারিত শ্রেণির ছোট ও মাঝারি খাদ্য ব্যবসার ক্ষেত্রেও নিবন্ধনের বিধান কার্যকর হবে। ফলে রাস্তার পাশের খাবারের দোকান থেকে শুরু করে বড় খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের নতুন নিয়ম সম্পর্কে জানতে হবে এবং নিজেদের ব্যবসার ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যে লাগবে লাইসেন্স
সাধারণ খাদ্য ব্যবসার নিবন্ধনের পাশাপাশি বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, আমদানি ও বিপণনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য লাইসেন্স নিতে হবে। এ তালিকায় রয়েছে স্বাস্থ্য সহায়ক ও সম্পূরক খাদ্য, বিশেষ পথ্য, প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক খাদ্য এবং নিউট্রাসিউটিক্যালসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত খাদ্যপণ্য। শিশুদের জন্য তৈরি ফর্মুলা দুধ এবং বয়স্ক ব্যক্তি কিংবা নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত মানুষের জন্য প্রস্তুত বিশেষ খাবারও এই ব্যবস্থার আওতায় থাকবে।
এ ছাড়া বংশগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত বা সংশোধিত খাদ্য, জৈব খাদ্য, কিরণ-সম্পাতকৃত খাদ্য, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য এবং অভিনব খাদ্যের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী নিবন্ধন বা লাইসেন্স নিতে হবে। যেসব খাদ্যপণ্য স্বাস্থ্যগত উপকার বা রোগের ঝুঁকি কমানোর দাবি করে বাজারজাত করা হয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে ‘নিরাপদ খাদ্য (বিজ্ঞাপন ও দাবি) প্রবিধানমালা, ২০২৫’ অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ, খাদ্যপণ্যের গুণাগুণ ও স্বাস্থ্যগত উপকারিতা সম্পর্কে প্রচার চালানোর ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হবে।
প্রথমবার নিবন্ধন বিনামূল্যে, মেয়াদ তিন বছর
বিএফএসএর বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নির্ধারিত ফি পরিশোধ এবং প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে নিবন্ধন ও লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হবে। নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ হবে তিন বছর। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তা নবায়ন করতে হবে। তবে নির্ধারিত ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার প্রথমবার নিবন্ধনের জন্য কোনো ফি দিতে হবে না। এতে ছোট ব্যবসায়ীদের নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক চাপ কমতে পারে।
অন্যদিকে, বিশেষায়িত খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের স্থাপনার লাইসেন্সের ফি নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানের আয়তনের ভিত্তিতে। ১০০ বর্গমিটার বা তার কম আয়তনের প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন লাইসেন্সের ফি ১০ হাজার টাকা। আর ১০ হাজার বর্গমিটারের বেশি আয়তনের প্রতিষ্ঠানের নতুন লাইসেন্সের ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ হাজার টাকা। ফলে প্রতিষ্ঠানভেদে প্রযোজ্য ফি ও শর্ত যাচাই করে আবেদন করতে হবে।
খাদ্যপণ্যের প্যাকেটে থাকতে হবে নিবন্ধন নম্বর
নতুন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো খাদ্যপণ্যের প্যাকেটে নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ করা। বিএফএসএর নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি খাদ্যপণ্যের প্যাকেটে কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন নম্বর থাকতে হবে। এর মাধ্যমে ভোক্তারা প্যাকেটের তথ্য দেখে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন সম্পর্কে জানতে পারবেন। পাশাপাশি কোনো খাদ্যপণ্য বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অভিযোগ থাকলে নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ করে অভিযোগ জানানোও সহজ হবে।
কর্তৃপক্ষের ধারণা, প্যাকেটে নিবন্ধন নম্বর ব্যবহারের ফলে খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয় শনাক্ত করা সহজ হবে। এতে ভোক্তাদের অভিযোগ নিষ্পত্তি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং খাদ্যপণ্যের নিরাপত্তা তদারকির কার্যক্রম আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে খাদ্য ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বাড়বে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।
প্রথমে জেলা কার্যালয়ে আবেদন, পরে চালু হবে অনলাইন ব্যবস্থা
নিবন্ধন ও লাইসেন্সের আবেদন প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট জেলা কার্যালয়ে জমা দেওয়া যাবে। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে শতভাগ অনলাইন আবেদনব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। অনলাইন ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হলে আবেদন জমা দেওয়া, প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ এবং নিবন্ধনসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার প্রক্রিয়া আরও সহজ হতে পারে।
তবে প্রাথমিক পর্যায়ে আবেদনকারীদের সংশ্লিষ্ট জেলা কার্যালয়ের মাধ্যমে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী কোন নিবন্ধন বা লাইসেন্স প্রয়োজন, কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে এবং প্রযোজ্য ফি কত—এসব বিষয় যাচাই করে আবেদন করার প্রস্তুতি নিতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
নিবন্ধন ছাড়া ব্যবসা করলে হতে পারে শাস্তি
বিএফএসএ জানিয়েছে, যেসব খাদ্য ব্যবসার নিবন্ধন বা লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক, সেসব ব্যবসা প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া পরিচালনা করা নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও লাইসেন্স নেওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
নতুন এই বিধান খাদ্য ব্যবসায়ীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে রাস্তার পাশের ছোট খাবারের দোকান, বেকারি, মিষ্টির দোকান ও প্যাকেটজাত খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে ব্যবসার ধরন অনুযায়ী নিবন্ধন ও লাইসেন্সের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে হবে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মতে, নতুন নিবন্ধন ও লাইসেন্সব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে খাদ্য ব্যবসায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, উৎপাদন ও বিপণনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে। ১ নভেম্বর থেকে আবেদন গ্রহণ শুরু হলে নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য ব্যবসাগুলোকে নতুন নিয়মের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে।