এআই দিয়ে তৈরি ভাইরাস প্রয়োগ মানুষের শরীরে

আইটি ডেস্ক

প্রকাশ:১৭:৫০,৩০ অক্টোবর ২০২৬

এআই দিয়ে তৈরি ভাইরাস প্রয়োগ মানুষের শরীরে

অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নকশা করা একটি বিশেষ ভাইরাস পরীক্ষামূলকভাবে এক রোগীর শরীরে প্রয়োগ করেছেন বিজ্ঞানীরা। যুক্তরাষ্ট্রের ওই রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ভাইরাসটি তৈরি করেছে ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক এআই স্টার্টআপ র‍্যাডিক্যাল নিউমেরিকস। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, চিকিৎসার উদ্দেশ্যে এআই দিয়ে নকশা করা ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রয়োগের ঘটনা এটিই প্রথম।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করা সম্ভব হচ্ছিল না, এমন গুরুতর ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে আক্রান্ত এক রোগীর শরীরে পরীক্ষামূলকভাবে ভাইরাসটি প্রয়োগ করা হয়েছে। এ ভাইরাস নকশার জন্য প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মডেল ‘ওমনি-১’ ব্যবহার করেছে। বিজ্ঞানীদের আশা, এ প্রযুক্তি ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণের চিকিৎসায় নতুন পথ খুলে দিতে পারে।

র‍্যাডিক্যাল নিউমেরিকসের তৈরি এআই মডেলটি মূলত ব্যাকটেরিওফাজ বা সংক্ষেপে ফাজ নামের বিশেষ ধরনের ভাইরাস নকশা করতে সক্ষম। সাধারণ ভাইরাসের মতো মানুষের কোষে আক্রমণ না করে ফাজ নির্দিষ্ট ধরনের ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে এবং সেগুলো ধ্বংস করতে পারে। এ কারণে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে চিকিৎসার বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ফাজ থেরাপি নিয়ে গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা।

সাধারণত ফাজ থেরাপির ক্ষেত্রে রোগীর শরীরে সংক্রমণ ঘটানো ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করতে সক্ষম এমন প্রাকৃতিক ভাইরাস খুঁজে বের করতে হয়। কিন্তু র‍্যাডিক্যাল নিউমেরিকসের এআই মডেল এ ক্ষেত্রে ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করেছে। নতুন কোনো ভাইরাস প্রকৃতিতে খোঁজার পরিবর্তে আগে থেকেই বিদ্যমান একটি ভাইরাসের নির্দিষ্ট অংশ পুনরায় নকশা করেছে এআই। এর লক্ষ্য হলো, সংক্রমণ ঘটানো নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়াকে আরও নিখুঁতভাবে শনাক্ত ও ধ্বংস করতে সক্ষম ভাইরাস তৈরি করা।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এআইনির্ভর এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে রোগীর সংক্রমণের ধরন বিশ্লেষণ করে কয়েক দিনের মধ্যেই উপযোগী ভাইরাস তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। বর্তমানে উপযুক্ত প্রাকৃতিক ফাজ খুঁজে বের করা এবং সেটিকে চিকিৎসার উপযোগী করে তোলার প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। এআইয়ের সহায়তায় এ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা গেলে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জটিল সংক্রমণের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

জানা গেছে, প্রচলিত চিকিৎসা কার্যকর না হলে বিশেষ পরিস্থিতিতে পরীক্ষামূলক চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে—এমন একটি কর্মসূচির আওতায় রোগীর শরীরে ভাইরাসটি প্রয়োগ করা হয়। চিকিৎসার আগে রোগীর শরীর থেকে সংগ্রহ করা ব্যাকটেরিয়ার নমুনায় ভাইরাসটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়েছিল। র‍্যাডিক্যাল নিউমেরিকসের দাবি, পরীক্ষাগারে ভাইরাসের মিশ্রণটি নমুনায় থাকা অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছিল। এ পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই পরবর্তী সময়ে রোগীর শরীরে ভাইরাসটি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তবে পরীক্ষামূলক চিকিৎসার পর রোগীর শারীরিক অবস্থার কী পরিবর্তন হয়েছে, সংক্রমণ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে কি না কিংবা রোগীর সুনির্দিষ্ট রোগনির্ণয় কী ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি চিকিৎসার ফলাফল এখনো কোনো স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতেও প্রকাশিত হয়নি। ফলে মানুষের শরীরে এআই দিয়ে নকশা করা ভাইরাস প্রয়োগের ঘটনা চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হলেও এর প্রকৃত কার্যকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি।

এআই দিয়ে ভাইরাস নকশায় সম্ভাবনার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। বিশেষ করে জটিল রোগের চিকিৎসা, নতুন ওষুধ আবিষ্কার এবং অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর পদ্ধতি উদ্ভাবনে এ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এআই ব্যবহার করে নতুন ভাইরাস নকশা করার সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর অপব্যবহার এবং জীববৈজ্ঞানিক নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এর আগে গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও আর্ক ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা এআই ব্যবহার করে নতুন ধরনের ভাইরাস নকশার গবেষণার কথা জানান। তাঁদের তৈরি ভাইরাসগুলো পরীক্ষাগারে ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছিল। গবেষণায় এআই দিয়ে নকশা করা প্রায় ৩০০টি ভাইরাল জিনোম সংশ্লেষণ ও পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ১৬টি কার্যকর ভাইরাস তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। তবে ওই গবেষণায় কোনো মানুষের শরীরে ভাইরাস প্রয়োগ করা হয়নি। পরীক্ষাগারে ব্যাকটেরিয়ার ওপরই এর কার্যকারিতা যাচাই করা হয়েছিল।

গবেষকদের মতে, এআইয়ের মাধ্যমে নতুন ভাইরাস নকশা করার সক্ষমতা চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে যেসব ব্যাকটেরিয়া প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করেছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে নির্দিষ্টভাবে কাজ করতে সক্ষম ফাজ তৈরি করা গেলে চিকিৎসার নতুন বিকল্প পাওয়া সম্ভব হবে। এতে বর্তমানে চিকিৎসা করা কঠিন হয়ে পড়া বিভিন্ন সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিজ্ঞানীরা বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন।

তবে একই প্রযুক্তি ভুল হাতে পড়লে মানুষ ও প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর ভাইরাস তৈরির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। এ কারণে এআই দিয়ে ভাইরাস নকশার গবেষণায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষাগার এবং কার্যকর তদারকির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন গবেষকেরা। স্ট্যানফোর্ডের গবেষকেরাও তাঁদের গবেষণায় মানুষ বা প্রাণীকে আক্রমণ করতে পারে এমন ভাইরাসের পরিবর্তে ব্যাকটেরিয়াকে লক্ষ্যবস্তু করে এমন ভাইরাস তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

সব মিলিয়ে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ভাইরাস নকশা করে মানুষের চিকিৎসায় পরীক্ষামূলক প্রয়োগ চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ যখন বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে, তখন ফাজ থেরাপির সঙ্গে এআই প্রযুক্তির সমন্বয় নতুন আশার জায়গা তৈরি করছে। তবে একটি পরীক্ষামূলক প্রয়োগের ভিত্তিতে এ চিকিৎসাকে এখনই সফল বা নিরাপদ বলা যাচ্ছে না। মানুষের শরীরে এর কার্যকারিতা, সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা, ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা ও কঠোর জীববৈজ্ঞানিক নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন