লক্ষ্য ২০৩০ বিশ্ব

আর্জেন্টিনার সঙ্গে চুক্তি নবায়নে রাজি স্কালোনি

প্রকাশ:১৫:১৮,২২ অক্টোবর ২০২৬

আর্জেন্টিনার সঙ্গে চুক্তি নবায়নে রাজি স্কালোনি

ফাইল ছবি

আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলের প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনির ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান জল্পনার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের পর তাঁর সঙ্গে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, এবার চুক্তি নবায়নে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছেন বিশ্বকাপজয়ী এই কোচ। আগামী বিশ্বকাপের পরও আর্জেন্টিনার ডাগআউটে তাঁকে দেখা যেতে পারে। দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে এবং প্রাথমিকভাবে ২০২৮ সালের কোপা আমেরিকা পর্যন্ত চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে সেই চুক্তি ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত সম্প্রসারণের সুযোগও রাখা হতে পারে। তবে চুক্তি নবায়নের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি।

আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় ক্রীড়া সাংবাদিক সিজার লুইস মেরলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্কালোনি ও এএফএ সভাপতি ক্লদিও তাপিয়ার মধ্যে চুক্তি নবায়ন নিয়ে আলোচনা বেশ ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। গত সেপ্টেম্বরের শেষদিকে দুই পক্ষের বৈঠকের পর এ প্রক্রিয়ায় গতি আসে। জাতীয় দলের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই চুক্তির বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। স্কালোনিও চুক্তি বাড়ানোর বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের দায়িত্বে থাকা নিয়ে নিজের সংশয়ের কথা জানিয়েছিলেন স্কালোনি। স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর হতাশা ও অভিমান থেকে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তিনি। ফলে তাঁর চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দায়িত্বে থাকবেন কি না, তা নিয়ে ফুটবলবিশ্বে আলোচনা শুরু হয়। তবে সাম্প্রতিক অগ্রগতি সেই অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমিয়ে এনেছে। এখন দুই পক্ষের আলোচনার চূড়ান্ত ফল এবং আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছেন আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা।

২০১৮ সালে অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হিসেবে আর্জেন্টিনার দায়িত্ব নেন স্কালোনি। তখন তাঁর নিয়োগ নিয়ে অনেকের মধ্যে সংশয় থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের দক্ষতা ও পরিকল্পনার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। ধীরে ধীরে দলকে নতুনভাবে গড়ে তুলে আর্জেন্টিনাকে আন্তর্জাতিক ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করেন এই কোচ। তাঁর অধীনেই দীর্ঘ শিরোপাখরা কাটিয়ে বড় প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিক সাফল্য পেতে শুরু করে দলটি।

স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ২০২১ সালের কোপা আমেরিকায়। ব্রাজিলকে হারিয়ে দীর্ঘ ২৮ বছর পর বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। এই জয় দলটির আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি স্কালোনির কোচিং দর্শনের ওপর আস্থা বাড়ায়। এরপর ২০২২ সালে ইতালিকে হারিয়ে ফিনালিসিমা জয় করে আর্জেন্টিনা। একই বছরের শেষ দিকে কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় দলটি। লিওনেল মেসির নেতৃত্বে বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা ফুটবলের সোনালি অধ্যায়ের সূচনা হয়।

বিশ্বকাপ জয়ের পরও সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখে আর্জেন্টিনা। ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দেয় দলটি। পরপর বড় টুর্নামেন্টে সাফল্যের কারণে স্কালোনি আর্জেন্টিনার ইতিহাসের অন্যতম সফল কোচ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তাঁর অধীনে দলটি শুধু শিরোপাই জেতেনি, বরং খেলোয়াড়দের মধ্যে সমন্বয়, কৌশলগত শৃঙ্খলা এবং কঠিন পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতাও তৈরি করেছে।

চুক্তি নবায়ন হলে স্কালোনির সামনে থাকবে আরও বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৮ সালের কোপা আমেরিকা এবং ২০৩০ সালের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে দলকে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে ধরে রাখতে হবে তাঁকে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের জায়গায় নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের তৈরি করা, দলের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা হবে তাঁর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ইতোমধ্যে আর্জেন্টিনা দলে প্রজন্মগত পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের ভবিষ্যৎ ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে নতুন ও তরুণ ফুটবলারদের সুযোগ দিচ্ছেন স্কালোনি। লিওনেল মেসি ও আনহেল দি মারিয়ার মতো তারকাদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি নতুন খেলোয়াড়দের সামর্থ্য যাচাই করছেন তিনি। তবে মেসি জাতীয় দল থেকে অবসর নেবেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। দলের অভিজ্ঞ ও তরুণ খেলোয়াড়দের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী দল গড়ে তোলাই এখন কোচিং পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য।

আর্জেন্টিনার হয়ে স্কালোনির ম্যাচসংখ্যাও তাঁর দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০১৮ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাঁর অধীনে দলটি শতাধিক ম্যাচ খেলেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা এ পর্যন্ত ১০৭টি ম্যাচ খেলেছে। তিনি যদি ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত দায়িত্বে থাকেন, তাহলে দলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচে কোচের দায়িত্ব পালনের রেকর্ড গড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আর্জেন্টিনার ইতিহাসে দীর্ঘ সময় ধরে কোচের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে গুইলারমো স্তাবিলের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৪০ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে একাধিক মেয়াদে আর্জেন্টিনা দলের কোচের দায়িত্ব পালন করে ১২৪টি ম্যাচে দলকে পরিচালনা করেছিলেন তিনি। স্কালোনি যদি দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্বে থেকে ম্যাচসংখ্যা বাড়াতে পারেন, তাহলে স্তাবিলের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। তবে এ ক্ষেত্রে ম্যাচসংখ্যা ও ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানের সুনির্দিষ্ট হিসাব নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট রেকর্ডের যাচাই এবং ভবিষ্যতে স্কালোনির দায়িত্বে থাকার সময়ের ওপর।

স্কালোনির সাফল্যের পেছনে খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, কৌশলগত নমনীয়তা এবং দলের পরিবেশ ধরে রাখার ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। তিনি অভিজ্ঞ তারকাদের ওপর নির্ভর করার পাশাপাশি তরুণ খেলোয়াড়দেরও সুযোগ দিয়েছেন। এতে দলটির মধ্যে প্রতিযোগিতা বজায় রয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক খেলোয়াড়কে বিভিন্ন ভূমিকায় ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বড় প্রতিযোগিতায় চাপ সামলানোর সক্ষমতা এবং দলগত সংহতিও তাঁর অধীনে আর্জেন্টিনার সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।

চুক্তি নবায়নের আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগিয়ে যাওয়ায় আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও আগ্রহ বাড়ছে। ২০২৮ সালের কোপা আমেরিকা এবং ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ সামনে রেখে দলকে কীভাবে সাজানো হবে, কোন তরুণ খেলোয়াড়েরা স্থায়ী জায়গা করে নেবেন এবং অভিজ্ঞ তারকাদের ভূমিকা কী হবে—এসব প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে একজন কোচের স্থায়িত্ব যেমন সহায়ক হতে পারে, তেমনি নতুন খেলোয়াড়দের গড়ে তোলা ও দল পুনর্গঠনের কাজও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, আর্জেন্টিনার সঙ্গে লিওনেল স্কালোনির চুক্তি নবায়নের সম্ভাবনা দলটির সমর্থকদের জন্য ইতিবাচক খবর। তাঁর অধীনে কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা ও বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনা এখন আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের পরও স্কালোনি দায়িত্বে থাকলে নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের নিয়ে দল পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ বড় প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন তিনি। তবে চুক্তির মেয়াদ, শর্ত ও সময়সীমা সম্পর্কে এএফএর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিষয়টিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তথ্যসূত্র: ওয়ানফুটবল।

আরও পড়ুন