আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ:১৩:৫৮,২৯ অক্টোবর ২০২৬
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হওয়ার আভাস মিলছে। তবে সংঘাতের অবসান ঘটাতে তেহরান নিজেদের শর্ত থেকে সরে আসবে না বলে সংকেত দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। যুদ্ধের অবসান এবং দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে ইরানের শর্তগুলো নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়টিও উঠে এসেছে আলোচনায়।
যুদ্ধের অবসানে নিজেদের শর্তে অনড় তেহরান
গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাইয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। বৈঠকে যুদ্ধের অবসান এবং ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’—এমন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।
ইরান সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ইংরেজি ভাষার সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংঘাতের অবসান ঘটানোর ক্ষেত্রে ইরানের নির্ধারিত শর্তগুলো নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন খামেনি। তাঁর এই অবস্থান থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ থাকলেও নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো থেকে সহজে সরে আসতে রাজি নয় তেহরান।
তবে বৈঠকে আলোচিত শর্তগুলোর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ কিংবা সেগুলো বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা প্রকাশ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গুরুত্ব
ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনার তথ্য অনুযায়ী, খামেনি ও মোহসেন রেজাইয়ের বৈঠকে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সুরক্ষার অংশ হিসেবে এ বিষয়ে আলোচনা করেন তাঁরা।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনে এই পথ ব্যবহৃত হয়। ফলে প্রণালিটির নিরাপত্তা ও নৌ চলাচল ঘিরে যেকোনো উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে যুদ্ধের মধ্যে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরানের অবস্থান শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এই নৌপথকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়লে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ
বৈঠকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংঘাতের বিস্তার ঠেকানোর ক্ষেত্রে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। কারণ, এই অঞ্চলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর পড়তে পারে।
তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে বৈঠকে ঠিক কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার আলোচনা হয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
খামেনির নির্দেশনায় গুরুত্ব দিচ্ছেন পেজেশকিয়ান
এদিকে বুধবার (২৮ অক্টোবর) ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে। এসব নির্দেশনা দেশের কৌশলগত দিকনির্দেশনা নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
পেজেশকিয়ান জানান, খামেনির নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে তাঁর সরকার নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করবে। একই সঙ্গে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, যুদ্ধ ও আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশনা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ইরান সরকার। পাশাপাশি পরিস্থিতির পরিবর্তন মোকাবিলায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুত রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যে কী বার্তা দিচ্ছে ইরান?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে সংঘাতের অবসান নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হওয়ার আভাসের মধ্যেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এই বক্তব্য সামনে এসেছে। একদিকে যুদ্ধের অবসানের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে, অন্যদিকে নিজেদের শর্ত ও কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষার ওপর জোর দিচ্ছে তেহরান।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়গুলো ইরানের আঞ্চলিক নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে সামনে এসেছে।
তবে কূটনৈতিক উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কতটা অগ্রসর হবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে সমঝোতার কোনো পথ তৈরি হবে কি না এবং সংঘাত বন্ধে পক্ষগুলো কী ধরনের শর্তে একমত হতে পারবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধের অবসানের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চললেও ইরান নিজেদের শর্ত নিশ্চিত করার বিষয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রাখার বার্তা দিচ্ছে। ফলে কূটনৈতিক তৎপরতা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান, আলোচনার অগ্রগতি এবং সম্ভাব্য সমঝোতার শর্তের ওপর।