আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ:১৫:৪৪,৩১ অক্টোবর ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস)-এর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব দিকনির্ণয় ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে মহাকাশে অত্যাধুনিক কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়েছে ভারত। দেশটির মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো শুক্রবার অন্ধ্রপ্রদেশের সতীশ ধওয়ান স্পেস সেন্টার থেকে জিএসএলভি রকেটের মাধ্যমে ‘এনভিএস-০৩’ নামের নতুন নেভিগেশন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে। ভারতের নিজস্ব উপগ্রহভিত্তিক দিকনির্ণয় ব্যবস্থা ‘নাভিক’কে আরও কার্যকর ও নির্ভুল করাই এই মিশনের প্রধান লক্ষ্য। সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের আশা, নতুন এই স্যাটেলাইট চালু হলে অবস্থান নির্ণয়, পথনির্দেশনা এবং সময় গণনার ক্ষেত্রে ভারতীয় প্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতাও কমবে।
স্যাটেলাইটটির সফল উৎক্ষেপণের পর শনিবার সকালে ইসরোর বিজ্ঞানীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি বলেন, ভারতীয় মহাকাশ বিজ্ঞানীদের নিষ্ঠা ও উদ্ভাবনী শক্তি দেশকে গর্বিত করে চলেছে। নিজস্ব স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এই মিশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন এনভিএস-০৩ স্যাটেলাইট বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে ভারতের স্বনির্ভর হওয়ার প্রচেষ্টাকে আরও এগিয়ে নেবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষও এই প্রযুক্তির মাধ্যমে উপকৃত হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সড়কপথে চলাচল, মানচিত্রে নির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত, যানবাহনের গতিপথ নির্ধারণ এবং সময় গণনার ক্ষেত্রে স্যাটেলাইটভিত্তিক নেভিগেশন ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। এসব ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস বহুল ব্যবহৃত একটি প্রযুক্তি। ভারতেও স্মার্টফোন, গাড়ির নেভিগেশন ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবায় জিপিএসের তথ্য ব্যবহার করা হয়। তবে কৌশলগত ও নিরাপত্তাগত কারণে দীর্ঘদিন ধরেই নিজস্ব নেভিগেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে নয়াদিল্লি। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ‘নাভিক’ ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এনভিএস-০৩ স্যাটেলাইটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এতে ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি রুবিডিয়াম পারমাণবিক ঘড়ি বা রুবিডিয়াম অ্যাটমিক ক্লক ব্যবহার করা হয়েছে। স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থায় সময়ের নির্ভুলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পৃথিবীতে কোনো ব্যবহারকারীর অবস্থান নির্ণয়ের জন্য স্যাটেলাইট থেকে পাঠানো সংকেতের যাত্রার সময় হিসাব করা হয়। সময় গণনায় সামান্য ভুল হলেও অবস্থান নির্ণয়ে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হতে পারে। নতুন স্যাটেলাইটের উন্নত সময় গণনা প্রযুক্তি নাভিকের সংকেতের নির্ভুলতা বাড়াতে সহায়তা করবে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।
নতুন স্যাটেলাইটটি এল১, এল৫ এবং এস ব্যান্ডে সংকেত পাঠাতে সক্ষম। এর মধ্যে এল১ ব্যান্ডের সঙ্গে বর্তমানে ব্যবহৃত অনেক স্মার্টফোন ও স্মার্টওয়াচের নেভিগেশন চিপ সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে নাভিকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ডিভাইস ব্যবহারকারীরা আরও উন্নত অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন। বিশেষ করে ডিজিটাল মানচিত্র, পথনির্দেশনা, যানবাহনের অবস্থান শনাক্ত এবং বিভিন্ন অবস্থানভিত্তিক সেবায় এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি উন্নত সময় সংকেতের কারণে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ব্যবস্থায় সময়ের সমন্বয় আরও নির্ভুল করার সুযোগ তৈরি হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএসের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি নিজস্ব সময় গণনা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও কাজ করছে ভারত। এ লক্ষ্যে দেশের পাঁচটি শহরের রিজিওনাল রেফারেন্স স্ট্যান্ডার্ড ল্যাবরেটরিজে জাতীয় সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সেকেন্ডারি টাইম-স্কেল তৈরি করা হয়েছে। শহরগুলো হলো গুয়াহাটি, ভুবনেশ্বর, বেঙ্গালুরু, আহমেদাবাদ ও ফরিদাবাদ। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জাতীয় সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সময় গণনা ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। ইসরোর নতুন স্যাটেলাইটের উন্নত সময় সংকেত এই ব্যবস্থাকে আরও নির্ভুল ও কার্যকর করতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রায় ২ হাজার ২৫০ কিলোগ্রাম ওজনের এনভিএস-০৩ ভারতের পরবর্তী প্রজন্মের নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিরিজের তৃতীয় উপগ্রহ। দেশটির নিজস্ব নেভিগেশন নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়াতে এই সিরিজের স্যাটেলাইটগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে এনভিএস-০৩ উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে জিএসএলভি রকেটের সফল উৎক্ষেপণের সংখ্যা ২০-এ পৌঁছেছে। ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির জন্য এটিও একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজস্ব নেভিগেশন ব্যবস্থা একটি দেশের প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিদেশি স্যাটেলাইট ব্যবস্থার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকলে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিংবা প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো সময় গুরুত্বপূর্ণ সেবা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। নিজস্ব স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক থাকলে দেশীয় যোগাযোগ, পরিবহন, প্রতিরক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি সেবায় বিকল্প প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব। এ কারণে ভারত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নাভিক ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে বিনিয়োগ করছে।
সব মিলিয়ে এনভিএস-০৩ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে নিজস্ব স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পথে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে ভারত। নতুন এই উপগ্রহের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অবস্থান নির্ণয় ও পথনির্দেশনার সেবার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা খাতেও সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা করছে দেশটি। তবে এর প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করবে স্যাটেলাইটটির কার্যক্রম, নাভিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বয় এবং ব্যবহারকারীদের ডিভাইসে এর প্রযুক্তিগত সমর্থনের ওপর।
সূত্র: আনন্দবাজার।