আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ:১৫:৪৩,৩১ অক্টোবর ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দুটি ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ট্রিএম ল্যাবস ও চেইনঅ্যানালাইসিসের ধারণা, এ হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা জড়িত থাকতে পারে। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতের দিকে মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে ১০টি ব্লকচেইনে বিন্যান্সের বিভিন্ন ওয়ালেট থেকে প্রায় ৬৩৬ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ সরিয়ে নেওয়া হয়। এত অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল সম্পদ স্থানান্তরের ঘটনা ক্রিপ্টোকারেন্সি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্রিপ্টো বিনিময় প্ল্যাটফর্ম বাইবিট থেকে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের সম্পদ চুরির ঘটনা সবচেয়ে বড় হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। নতুন এই ঘটনার পর আগের রেকর্ডও ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, চুরি হওয়া সম্পদের মধ্যে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার ইতোমধ্যে জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান টেথার ও সার্কেল যৌথভাবে ২৩০ কোটির বেশি ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে। তবে অবশিষ্ট অর্থের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত জানায়নি বিন্যান্স। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, চুরি হওয়া সম্পদ শনাক্ত, লেনদেনের গতিপথ অনুসরণ এবং বিভিন্ন ওয়ালেটে থাকা অর্থ জব্দের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এই তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে চুরির মোট পরিমাণের হিসাবেও পরিবর্তন আসতে পারে বলে সতর্ক করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
ট্রিএম ল্যাবসের দাবি, উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার গোষ্ঠী ট্রেডারট্রেইট এ হামলার সঙ্গে জড়িত। গোষ্ঠীটি কুখ্যাত লাজারাস গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। চেইনঅ্যানালাইসিসও তাদের নিজস্ব অনুসন্ধানে উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে একই ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো স্বাধীনভাবে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। বিন্যান্সের সহপ্রধান নির্বাহী রিচার্ড টেং জানিয়েছেন, তদন্তের এই পর্যায়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ী করা সম্ভব হয়নি। শুরুতে প্রতিষ্ঠানটির একজন প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার মাধ্যমে হামলার সূত্রপাত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী তদন্তে আরও কয়েকটি সম্ভাব্য অনুপ্রবেশের পথ শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে বিন্যান্স।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর কোরিয়ার জন্য ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে। দেশটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হ্যাকার গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল ওয়ালেট এবং আর্থিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত। এসব অর্থ দেশটির অর্থনীতি সচল রাখা এবং জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে ব্যয় হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। তবে বিন্যান্সের এই নির্দিষ্ট ঘটনায় চুরি হওয়া অর্থের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির কোনো সরাসরি সম্পর্ক এখনো নিশ্চিত হয়নি।
এদিকে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টো বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায়। বিটকয়েনের দাম ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে ৭৬ হাজার ৩৬৮ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি ইথারের দামও ৩ শতাংশের বেশি কমে দুই মাসের সর্বনিম্ন ২ হাজার ১৭৮ ডলারে নেমে আসে। বড় একটি ক্রিপ্টো বিনিময় প্ল্যাটফর্মে এত বিপুল পরিমাণ সম্পদ চুরির খবর বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ডিজিটাল সম্পদের নিরাপত্তা, এক্সচেঞ্জগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং গ্রাহকদের অর্থ সংরক্ষণের ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে বিন্যান্স জানিয়েছে, তাদের জরুরি তহবিল ‘সিকিউর অ্যাসেট ফান্ড ফর ইউজারস’-এ প্রায় ১০০ কোটি ডলার রয়েছে। তবে এই তহবিলের পরিমাণ চুরি হওয়া সম্পদের ছয় ভাগের এক ভাগেরও কম। ফলে এত বড় ক্ষতির বিপরীতে জরুরি তহবিলের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যদিও প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে প্রয়োজন হলে নিজস্ব অন্যান্য তহবিল ব্যবহার করা হবে। অর্থাৎ জরুরি তহবিলের পরিমাণের বাইরে গিয়েও গ্রাহকদের ক্ষতি পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিন্যান্স।
ট্রিএম ল্যাবসের ২০২৬ সালের ক্রিপ্টো অপরাধবিষয়ক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় ১৫০টি পৃথক সাইবার হামলায় মোট ২৮৭ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরি হয়েছে। এই পরিসংখ্যান ডিজিটাল সম্পদ খাতে সাইবার অপরাধের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির চিত্র তুলে ধরেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবস্থায় লেনদেন দ্রুত সম্পন্ন করা গেলেও নিরাপত্তার দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি ঘটানো সম্ভব। তাই এক্সচেঞ্জগুলোর প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা জোরদার, নিয়মিত সাইবার অডিট এবং সন্দেহজনক লেনদেন দ্রুত শনাক্ত করার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
শুক্রবার বিন্যান্স জানিয়েছে, চুরি হওয়া সম্পদ উদ্ধারে বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে। পাশাপাশি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা অর্থ উত্তোলন কার্যক্রম ৪৫ ঘণ্টার মধ্যে আবার চালু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে গ্রাহকদের জন্য স্বাভাবিক লেনদেন কার্যক্রম পুরোপুরি চালু করতে নিরাপত্তা যাচাই ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ সম্পন্ন করতে হবে।
সব মিলিয়ে বিন্যান্সে এই বড় ধরনের ক্রিপ্টো চুরির ঘটনা ডিজিটাল মুদ্রা বাজারের নিরাপত্তা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। চুরি হওয়া সম্পদের একটি বড় অংশ জব্দ করা সম্ভব হলেও বাকি অর্থ উদ্ধার এবং হামলার প্রকৃত হোতাদের শনাক্ত করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে গ্রাহকদের সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারে কি না, সেদিকেও নজর থাকবে আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টো বাজারের বিনিয়োগকারীদের।
সূত্র: আল-জাজিরা, রয়টার্স।