দাবানলের ধোঁয়ায় বাড়ে অটিজমের ঝুঁকি: গবেষণা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ:১৫:১৪,২৯ অক্টোবর ২০২৬

দাবানলের ধোঁয়ায় বাড়ে অটিজমের ঝুঁকি: গবেষণা

দাবানলের ধোঁয়ার সংস্পর্শে গর্ভস্থ শিশুর অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে (এএসডি) আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত এক বিস্তৃত গবেষণায়। প্রায় ৯ লাখ মা ও শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা গর্ভাবস্থায় দাবানলজনিত বায়ুদূষণের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন। বিশেষ করে গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে ধোঁয়ার সংস্পর্শের বিষয়টি গবেষণায় গুরুত্ব পেয়েছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, গর্ভাবস্থায় দাবানলের ধোঁয়া থেকে সৃষ্ট অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণার গড় ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ০.৭৫ মাইক্রোগ্রাম বৃদ্ধি পেলে শিশুর অটিজম শনাক্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, এই ফলাফল থেকে ধোঁয়ার কারণে সরাসরি অটিজম হয়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

গর্ভাবস্থায় বায়ুদূষণ কেন উদ্বেগের বিষয়?

গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের দ্রুত বিকাশ ঘটে। এ সময় মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সংযোগ তৈরি হয় এবং স্নায়ুকোষের কার্যক্রম ক্রমশ পরিণত হতে থাকে। এই গুরুত্বপূর্ণ বিকাশপর্বে ক্ষতিকর পরিবেশগত উপাদানের সংস্পর্শ স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।

দাবানলের ধোঁয়ায় থাকা অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করে। এসব কণার কিছু শরীরের গভীর অংশে পৌঁছে প্রদাহ ও অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। গর্ভাবস্থায় এ ধরনের প্রতিক্রিয়া কীভাবে ভ্রূণের বিকাশকে প্রভাবিত করতে পারে, তা নিয়ে গবেষণা চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গর্ভাবস্থায় পরিবেশগত দূষণের প্রভাব বোঝার জন্য গর্ভকালীন সময়, দূষণের মাত্রা এবং সংস্পর্শের স্থায়িত্ব বিবেচনা করা জরুরি। তবে অটিজমের মতো স্নায়ুবিকাশজনিত অবস্থার পেছনে একাধিক জটিল কারণ কাজ করে।

দাবানলের ধোঁয়ায় কী কী ক্ষতিকর উপাদান থাকে?

দাবানলের ধোঁয়া শুধু ছাই বা কালো ধোঁয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এতে থাকতে পারে অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা, কার্বন মনোক্সাইড, বিভিন্ন উদ্বায়ী জৈব যৌগ এবং অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ। আগুনে কী ধরনের গাছপালা, আবাসিক ভবন, প্লাস্টিক, রং কিংবা ইলেকট্রনিক সামগ্রী পুড়ছে, তার ওপর ধোঁয়ার রাসায়নিক গঠন নির্ভর করে।

বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, বাতাসের সঙ্গে এসব ক্ষুদ্র কণা আগুনের উৎপত্তিস্থল থেকে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে দাবানল সরাসরি কোনো এলাকায় না ঘটলেও সেখানকার বাসিন্দারা দূষিত বাতাসের সংস্পর্শে আসতে পারেন। এমনকি আকাশে ধোঁয়া স্পষ্টভাবে দেখা না গেলেও বাতাসে ক্ষতিকর বস্তুকণা থাকতে পারে।

ধোঁয়া ও অটিজমের সম্পর্ক কতটা নিশ্চিত?

গবেষণার ফলাফল উদ্বেগ তৈরি করলেও এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় কোনো পরিবেশগত উপাদানের সংস্পর্শের সঙ্গে একটি স্বাস্থ্যগত অবস্থার সম্পর্ক পাওয়া গেলেও তা থেকে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক নিশ্চিত করা যায় না।

অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার একটি জটিল স্নায়ুবিকাশজনিত অবস্থা। এর সঙ্গে জিনগত বৈশিষ্ট্যসহ বিভিন্ন জৈবিক ও পরিবেশগত বিষয়ের সম্পর্ক রয়েছে। দাবানলের ধোঁয়ার সংস্পর্শ এই ঝুঁকিতে কী ভূমিকা রাখতে পারে, তা নির্ধারণের জন্য আরও গবেষণা দরকার।

গবেষণায় উল্লেখিত ৩০ শতাংশ বৃদ্ধির অর্থও এই নয় যে ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসা প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে ৩০ জন অটিজমে আক্রান্ত হবেন। এটি গবেষণায় পাওয়া আপেক্ষিক ঝুঁকির পরিবর্তন বোঝাতে পারে; ব্যক্তিগত বা পরম ঝুঁকি নির্ধারণে আরও তথ্য প্রয়োজন।

গর্ভবতী নারী ও পরিবারের করণীয়

দাবানলের ধোঁয়া কিংবা অন্য ধরনের বায়ুদূষণ থেকে সুরক্ষিত থাকা গর্ভবতী নারীসহ সবার স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঝুঁকি কমাতে কয়েকটি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

  • বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করুন: স্থানীয় বায়ুমান সূচক (একিউআই) এবং দাবানলের ধোঁয়া-সংক্রান্ত সতর্কবার্তা অনুসরণ করুন।
  • বাইরের কার্যক্রম সীমিত রাখুন: বাতাসে দূষণের মাত্রা বেশি থাকলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাইরে থাকা ও কঠোর শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলুন।
  • ঘরের বাতাস পরিষ্কার রাখুন: জানালা-দরজা বন্ধ রাখুন, যদি বাইরের বাতাস দূষিত হয়। সম্ভব হলে উপযুক্ত HEPA ফিল্টারযুক্ত বায়ু পরিশোধক ব্যবহার করুন।
  • ধোঁয়া ঘরে প্রবেশ ঠেকান: বাইরে থেকে দূষিত বাতাস প্রবেশের পথ কমিয়ে আনুন এবং ঘরের ভেতরে ধূমপান বা অন্য কোনো ধরনের ধোঁয়া তৈরি হয়—এমন কাজ এড়িয়ে চলুন।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ নিন: গর্ভাবস্থায় দূষণের সংস্পর্শ নিয়ে উদ্বেগ থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন।

সচেতনতা ও আরও গবেষণার ওপর গুরুত্ব

গবেষণাটি গর্ভাবস্থায় বায়ুদূষণের সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে দাবানলের ধোঁয়া কীভাবে ভ্রূণের স্নায়ুবিকাশকে প্রভাবিত করতে পারে, তা আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

গবেষকেরা এ ধরনের সম্পর্কের প্রকৃতি ও প্রভাব নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত গবেষণা, উন্নত বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণ এবং গর্ভবতী নারীদের জন্য কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদারের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

সারকথা: দাবানলের ধোঁয়ার সংস্পর্শ ও শিশুর অটিজমের ঝুঁকির মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও এখনই একে সরাসরি কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। তবে গর্ভাবস্থায় বায়ুদূষণ থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা মা ও শিশুর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: ইউরোনিউজ

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন