আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ:১৫:৩২,৩১ অক্টোবর ২০২৬
বিশ্ব রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা, বাণিজ্যিক বিরোধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন অংশীদারত্ব গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এ লক্ষ্যে ‘অ্যালায়েন্স ফর দ্য ফিউচার’ নামে নতুন একটি জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে দুই পক্ষ। একই ধরনের মূল্যবোধ, গণতন্ত্র ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বিশ্বাসী অন্যান্য দেশকেও এ জোটে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনীতি, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও কূটনীতিতে নতুন বাস্তবতার মুখে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো এবং একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভরতা কমানোই এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
শুক্রবার কানাডার মন্ট্রিলে দুই দিনের শীর্ষ সম্মেলন শেষে দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন নতুন এই অংশীদারত্বের ঘোষণা দেন। সম্মেলনে দুই পক্ষের নেতারা অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করেন। তাদের মতে, কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্যদেশের মধ্যে আরও গভীর সহযোগিতা গড়ে তোলা গেলে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অভূতপূর্ব স্থিতিশীলতা ও নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সমমনা দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে।
সম্মেলনে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, জলবায়ু সংকট, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং বাণিজ্যকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা তাদের সমাজগুলোকে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বাড়ছে এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলায় এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে সব চ্যালেঞ্জ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে সমমনা দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য, সহযোগিতা ও পারস্পরিক আস্থা বাড়ানো জরুরি। তার মতে, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব শুধু দুই পক্ষের জন্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নতুন জোট গঠনের পাশাপাশি ইউক্রেনকে সহায়তার বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে কানাডা। সম্মেলনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৯ হাজার কোটি ইউরোর ঋণ কর্মসূচিতে অবদান রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দেশটি। ইউক্রেনের চলমান সংকট মোকাবিলা এবং দেশটির অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখতে এই সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা। এ ছাড়া ভবিষ্যতে কয়েক হাজার কোটি ডলারের সমন্বিত বাজার গড়ে তোলার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে বাণিজ্য ও ভ্রমণের প্রতিবন্ধকতা কমানো, শিক্ষা বিনিময়ের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা তৈরির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে কানাডার নতুন অংশীদার খোঁজার উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতিকে কেন্দ্র করে কানাডা ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কে চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কানাডা তার অর্থনীতি ও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি খাতকে আরও বহুমুখী করতে চাইছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর মতো কৌশলগত খাতে মার্কিন প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা করছে অটোয়া। কারণ প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ইউক্রেন যুদ্ধে স্টারলিংক ও স্টারশিল্ড সেবার গতি কমিয়ে দেওয়ার ঘটনা কানাডার এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিকল্প সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি মনে করছেন, নিজস্ব ও অংশীদার দেশগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে নির্ভরশীলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।
এ প্রেক্ষাপটে কানাডার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান কোহিয়ার এবং জার্মানির আলেফ আলফার সম্ভাব্য একীভূতকরণকে বিকল্প প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেছেন কার্নি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় থাকবে জার্মানির বার্লিন ও কানাডার টরন্টোতে। এ উদ্যোগে কানাডা সরকার সর্বোচ্চ ১৬০ কোটি কানাডীয় ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এর মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা, উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরির সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইউরোপের সুপারকম্পিউটিং নেটওয়ার্কে কানাডার যুক্ত হওয়ার বিষয়েও দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি হয়েছে। এতে উন্নত কম্পিউটিং অবকাঠামো, গবেষণা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির উন্নয়নে যৌথভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কানাডার প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। কানাডাকে ইইউর ‘সহযোগী সদস্য’ করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন নেতারা। তবে এ ধরনের সদস্যপদের কাঠামো, অধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কানাডার ভূমিকা কী হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আগামী ২০২৭ সালের সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত কাঠামো নির্ধারণের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি সদস্যদেশ অবশ্য কানাডাকে সহযোগী সদস্য করার ধারণা নিয়ে আপত্তি তুলেছিল। ফলে প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের আগে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরির প্রয়োজন হবে।
এদিকে ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা কানাডার সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে দেশটিকে ইউরোপের বাইরের দেশগুলোর মধ্যে ‘সবচেয়ে বেশি ইউরোপীয়’ বলে অভিহিত করেছেন। তার এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে কানাডার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। দুই পক্ষের নেতারা মনে করছেন, অভিন্ন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি অঙ্গীকার নতুন অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করবে।
তবে নতুন জোট গঠনের ঘোষণা ঘিরে কানাডার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়া কুইবেক প্রদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী দল পার্টি কেবেকোয়ার নেতা এবং প্রাদেশিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব পল সেন্ট-পিয়ের প্লামন্ডন সম্মেলনে অংশ নেননি। অটোয়া তাকে অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না দেওয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ নিয়ে প্রদেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনেও কানাডার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতপার্থক্য সামনে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন জোট শুধু একটি বাণিজ্যিক বা কূটনৈতিক উদ্যোগ নয়; বরং পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করা এই উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে জোটটির প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করবে ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলো কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, সদস্যদেশগুলোর মধ্যে কতটা সমন্বয় তৈরি হয় এবং প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কতটা স্বনির্ভর সক্ষমতা গড়ে তোলা সম্ভব হয় তার ওপর।