তালেবানের দমন-পীড়ন ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে পাকিস্তানের হুঁশিয়ারি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ:১৫:৩৬,৩১ অক্টোবর ২০২৬

তালেবানের দমন-পীড়ন ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে পাকিস্তানের হুঁশিয়ারি

আফগানিস্তানে নারী ও তরুণীদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ ও দমন-পীড়ন বন্ধ করতে তালেবান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে পাকিস্তান। একই সঙ্গে আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে সন্ত্রাসী হামলা পরিচালনা করা থেকে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে বিরত রাখার দাবি জানিয়েছে ইসলামাবাদ। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে আফগানিস্তানবিষয়ক এক আলোচনা সভায় পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এসব উদ্বেগ তুলে ধরা হয়। দেশটির দাবি, আফগানিস্তান থেকে পরিচালিত সন্ত্রাসী হামলায় গত তিন বছরে ৪ হাজার ৭০০ জনেরও বেশি পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে আফগানিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

আলোচনা সভায় পাকিস্তানের প্রতিনিধি মুহাম্মদ জাওয়াদ আজমল বলেন, আফগানিস্তানের ভূখণ্ডে সক্রিয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি এবং তাদের কর্মকাণ্ড প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে তালেবান প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তার অভিযোগ, আফগানিস্তান থেকে পরিচালিত হামলার কারণে পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাণহানি ও নিরাপত্তাঝুঁকি বেড়েছে। বিশেষ করে বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসার পর থেকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে দাবি করেছে ইসলামাবাদ।

পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই কাবুলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে, আফগান ভূখণ্ড যেন কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী পাকিস্তানের ভেতরে হামলা চালানোর জন্য ব্যবহার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। দেশটির অভিযোগ, আফগানিস্তানে অবস্থানরত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী সীমান্ত অতিক্রম করে পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। তবে আফগান তালেবান প্রশাসন বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ফলে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে নিরাপত্তা ও সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে।

মুহাম্মদ জাওয়াদ আজমল তার বক্তব্যে বলেন, আফগানিস্তানের নিরাপত্তা সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ সন্ত্রাসবাদ। আফগান তালেবান ও বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মধ্যকার যোগসূত্র এবং পাকিস্তানসহ অন্যান্য প্রতিবেশী দেশকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে বিভিন্ন পক্ষের সমর্থনের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, এসব গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের প্রকাশ্য নিন্দা জানাতে তালেবান প্রশাসনের ধারাবাহিক ব্যর্থতা তাদের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসাজশ ও সমর্থনের বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে।

তিনি আরও বলেন, নিজেদের জনগণ ও জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে অব্যাহত সন্ত্রাসী হামলার মুখে পাকিস্তান নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে না। দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতি যেকোনো হুমকির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন মেনে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করবে ইসলামাবাদ। প্রয়োজনে এ অধিকার প্রয়োগের বিষয়টিও পাকিস্তান বিবেচনায় রাখবে বলে জানান তিনি।

সন্ত্রাসবাদ ও নিরাপত্তার পাশাপাশি আফগানিস্তানে নারী ও মেয়েদের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পাকিস্তান। জাওয়াদ আজমল বলেন, নারী ও মেয়েদের মৌলিক স্বাধীনতা, অধিকার ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করার মাধ্যমে তালেবান তাদের আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি থেকে ক্রমাগত সরে যাচ্ছে। এ ধরনের বৈষম্যমূলক ও নিপীড়নমূলক আচরণ ইসলামি আইন, ঐতিহ্য এবং মুসলিম বিশ্বাসের মৌলিক নীতিগুলোর সঙ্গেও সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেন তিনি। তালেবান প্রশাসনের প্রতি নারী ও তরুণীদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার এবং তাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান পাকিস্তানের প্রতিনিধি।

এদিকে জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টার রিচার্ড বেনেটও আফগানিস্তানের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ক্ষমতা গ্রহণের পাঁচ বছর পরও তালেবান সুপরিকল্পিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো বন্ধ করার কোনো আগ্রহ দেখায়নি। বরং বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের ওপর বিধিনিষেধ আরও কঠোর করা হয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আফগান নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চলাফেরা এবং জনজীবনে অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত করার মাধ্যমে তাদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন মানবাধিকার সংশ্লিষ্টরা।

আফগান শরণার্থীদের বিষয়টিও জাতিসংঘের আলোচনা সভায় গুরুত্ব পেয়েছে। জাওয়াদ আজমল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, অসহায় আফগান শরণার্থীদের প্রতি সবার দায়িত্ব রয়েছে। কয়েক দশক ধরে পাকিস্তান লাখ লাখ আফগান শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এসব শরণার্থী পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক সহায়তা পাননি। পাকিস্তানের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তাদের সহায়তা অব্যাহত রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে শরণার্থীদের আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণের দায়িত্ব শুধু একটি দেশের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে এসে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে আফগানিস্তানের মানবিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কিছু আফগান অভিবাসীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা এবং সাবেক সেনাসদস্য ও বিভিন্ন অধিকারকর্মী সংগঠনের একটি জোট। শুক্রবার ‘আফগানইভ্যাক’-এর প্রধান শন ভ্যানডাইভার জানান, যেসব আফগান অভিবাসীকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে, তাদের অনেকেই ২০২১ সালে তালেবানের ক্ষমতা দখল এবং আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর দেশটি ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫০ জনেরও বেশি আফগান অভিবাসীকে দেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে। এটি আফগান নাগরিকদের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় একক বহিষ্কার অভিযান হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংবাদপত্রটির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যে কয়েক ডজন আফগান অভিবাসীকে আটক করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। তাদের আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সোমবারই প্রথম ফেরত পাঠানোর ফ্লাইট ছেড়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং তালেবানের ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশটি থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিরাপত্তার আশঙ্কায় পালিয়ে যান। তাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করা সাবেক আফগান সেনা, সরকারি কর্মকর্তা, সহযোগী কর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও ছিলেন। তাদের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ফলে এসব অভিবাসীকে আবার তালেবান শাসিত আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা মানবাধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিবাসনসংক্রান্ত কঠোর পদক্ষেপ এবং অবৈধ অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কার্যক্রমকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। তবে আফগান অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি দেশটির হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ। সংস্থাটি জানিয়েছে, কার্যক্রমের নিরাপত্তার স্বার্থে ভবিষ্যতে কাকে বা কখন ফেরত পাঠানো হবে, সে বিষয়ে তারা আগাম কোনো তথ্য নিশ্চিত করবে না।

সব মিলিয়ে আফগানিস্তানকে ঘিরে পাকিস্তান, তালেবান প্রশাসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। একদিকে আফগানিস্তানে নারী ও মেয়েদের অধিকার এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মহল উদ্বেগ প্রকাশ করছে, অন্যদিকে আফগান ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত সন্ত্রাসী হামলার অভিযোগ তুলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে পাকিস্তান। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেওয়া আফগান নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা যুক্ত হওয়ায় শরণার্থী নিরাপত্তা ও মানবিক দায়িত্বের প্রশ্নও সামনে এসেছে। পরিস্থিতির সামগ্রিক সমাধানে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র: ডন, জিও নিউজ, নিউ ইয়র্ক টাইমস।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন