পশ্চিম তীরে ইসরায়েল সরকারের ওপরও নিষেধাজ্ঞার দাবি ব্রিটিশ এমপির

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ:১৫:৩৭,৩১ অক্টোবর ২০২৬

পশ্চিম তীরে ইসরায়েল সরকারের ওপরও নিষেধাজ্ঞার দাবি ব্রিটিশ এমপির

অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের পাশাপাশি দেশটির সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানিয়েছেন এক ব্রিটিশ সংসদ সদস্য। তার মতে, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা, ভূমি দখল এবং উচ্ছেদের ঘটনা শুধু উগ্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড নয়; বরং এর সঙ্গে ইসরায়েল সরকারের রাষ্ট্রীয় নীতি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাই শুধু বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে সীমিত ব্যবস্থা না নিয়ে ইসরায়েল সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, অর্থায়নকারী সংস্থা এবং সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে যুক্তরাজ্য সরকারের দ্রুত ও বিস্তৃত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

একটি নিবন্ধে ওই ব্রিটিশ এমপি জানান, চলতি সপ্তাহে আরও দুই ব্রিটিশ সংসদ সদস্য এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নিয়ে গঠিত একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে তিনি অধিকৃত পশ্চিম তীরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। কিন্তু ইসরায়েলি বাহিনী তাদের আট ঘণ্টার মতো জিজ্ঞাসাবাদ ও আটক রাখার পর সীমান্ত অতিক্রমের অনুমতি দেয়নি। ফলে প্রতিনিধিদলটি পশ্চিম তীরে প্রবেশ করতে পারেনি। ওই এমপির ভাষ্য, একজন সংসদ সদস্য হিসেবে কয়েক ঘণ্টা আটক থাকার অভিজ্ঞতা দখলদারির মধ্যে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের প্রতিদিনের দুর্ভোগের তুলনায় কিছুই নয়। ফিলিস্তিনিরা প্রতিনিয়ত চলাচলে বাধা, নিরাপত্তাহীনতা, সহিংসতা এবং ভূমি হারানোর আশঙ্কার মধ্যে জীবনযাপন করছেন।

ওই ব্রিটিশ সংসদ সদস্য তার নিবন্ধে গাজা ও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার অভিযোগ, গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এবং পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ধারাবাহিক নিপীড়ন একই বৃহত্তর সংকটের অংশ। তিনি পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ভূমি ও বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ এবং তাদের অস্তিত্ব সংকুচিত করার প্রচেষ্টাকে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেন। নিবন্ধে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের বক্তব্যের প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, গত মাসে তিনি অধিকৃত পশ্চিম তীরেও গাজার মতো সামরিক অভিযান পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

লেখকের অভিযোগ, ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন ও সহিংসতার প্রকৃত চিত্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে আড়াল করার চেষ্টা করছে ইসরায়েল। তার দাবি, গত ১৮ মাসে ব্রিটিশ সংসদ সদস্যদের দুটি প্রতিনিধিদলকে পশ্চিম তীরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এর ফলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও জনপ্রতিনিধিদের পক্ষে সরেজমিনে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি মনে করেন, পশ্চিম তীরের বাস্তব পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলের সামনে তুলে ধরতে সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক এবং মানবাধিকারকর্মীদের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়েও নিবন্ধে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, গাজায় গত তিন বছরে ইসরায়েলি হামলায় ২০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া গত সপ্তাহে পশ্চিম তীরের হেবরনে বাড়িঘর ধ্বংসের ঘটনা ধারণ করতে যাওয়া সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে ইসরায়েলি বাহিনী কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ব্রিটিশ এমপির মতে, সাংবাদিকদের ওপর এ ধরনের হামলা ও বাধা স্বাধীন সংবাদ পরিবেশন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

এদিকে অধিকৃত পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতিগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন ওই সংসদ সদস্য। তবে তার মতে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের জন্য ছয় মাস অপেক্ষা করার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং যত দ্রুত সম্ভব তা বাস্তবায়ন করা উচিত। তিনি বলেন, শুধু অবৈধ বসতি স্থাপনকারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। কারণ এসব বসতি গড়ে তোলা ও পরিচালনার পেছনে বিভিন্ন কোম্পানি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের ভূমিকা রয়েছে। তাই বসতি স্থাপনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কোম্পানির পাশাপাশি এসব বসতিতে অর্থায়নকারী, বিমা সেবা প্রদানকারী এবং নজরদারি প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা প্রয়োজন। তার মতে, বসতি স্থাপনের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল করে দেওয়া গেলে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে।

ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রি ও সামরিক সহযোগিতার বিষয়েও কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং ইসরায়েলি বাহিনীকে প্রশিক্ষণে সহায়তাকারী উড়োজাহাজের লাইসেন্স বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন ওই এমপি। তার বক্তব্য, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের মধ্যে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে অস্ত্র ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যকে অস্ত্র রপ্তানির বিদ্যমান নীতিমালা আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং নিষেধাজ্ঞার ফাঁকফোকর বন্ধ করতে হবে।

গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং ইসরায়েলি মন্ত্রীদের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানিয়েছেন ওই ব্রিটিশ সংসদ সদস্য। তার মতে, গাজায় মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় খাদ্য, ওষুধ ও জরুরি চিকিৎসাসামগ্রীর অবাধ প্রবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে গাজার ওপর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের পথ উন্মুক্ত করতে হবে। মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত করার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়েও তিনি গুরুত্ব দেন।

নিবন্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের নির্দেশনা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে। ব্রিটিশ এমপির বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের নির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে ইসরায়েলের অবৈধ দখলদারিত্ব টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে এমন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বন্ধ করা যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য দেশের দায়িত্ব। এ কারণে শুধু বসতি স্থাপনকারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করাই যথেষ্ট নয়; দখলদারিত্বের সঙ্গে যুক্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক এবং সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের বাধা নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন ওই ব্রিটিশ সংসদ সদস্য। তার দাবি, যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা শুধু ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা বিবেচনায় নিতে হবে।

সূত্র: আল-জাজিরা।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন