জান্নাত হোসেন
প্রকাশ:১৫:১৬,২ নভেম্বর ২০২৬
১১ দলীয় জোটের কর্মসূচিতে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি এবং সিটি নির্বাচন নিয়ে আসন সমঝোতার বিরোধকে কেন্দ্র করে জামায়াতের সঙ্গে দলটির দূরত্ব বাড়ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর এনসিপির জোট ছাড়ার গুঞ্জনও জোরালো হচ্ছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ অক্টোবর এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেনের উপস্থিতিতে ওই বৈঠকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে জোটের কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়। নিজেদের রাজনৈতিক সক্ষমতা যাচাই করতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
ইতোমধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে এনসিপি। ঢাকা দক্ষিণে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং ঢাকা উত্তরে সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে প্রার্থী করেছে দলটি।
গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) ১১ দলীয় ঐক্যের সাত দফা দাবিতে ঢাকা থেকে খুলনা-কুষ্টিয়া অভিমুখে লংমার্চ শুরু হয়। সকাল ৭টায় কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর সকাল ৮টা ২০ মিনিটে বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেট থেকে গাড়িবহর রওনা দেয়।
উদ্বোধনী সমাবেশে বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তাঁর বক্তব্যের পর এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের জন্য একটি চেয়ার খালি রাখা হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি উপস্থিত হননি।
তাঁর পরিবর্তে কর্মসূচিতে অংশ নেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ এবং সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব সার্জিস আলম। তবে উদ্বোধনী সমাবেশে তাঁদের কেউ বক্তব্য দেননি।
ঢাকা, খুলনা, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ায় আয়োজিত এই লংমার্চে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি করেছে। এর আগে অনুষ্ঠিত দুটি লংমার্চে নাহিদ ইসলামসহ কেন্দ্রীয় নেতারা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। যদিও পরবর্তী সময়ে কর্মসূচির মাঝপথে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, আরিফুল ইসলাম আদীব, আব্দুল হান্নান মাসউদ ও যুগ্ম সদস্য সচিব এস এম সাইফ মুস্তাফিজ অংশ নেন।
এনসিপির এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা ও বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার কারণে ব্যস্ত ছিলেন নাহিদ ইসলাম। এ কারণেই তিনি লংমার্চে যেতে পারেননি।
তবে দলের আরেক শীর্ষ নেতার দাবি, বিষয়টি শুধু ব্যস্ততার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সিটি নির্বাচনে আসন সমঝোতা নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে কয়েক দিন ধরে মতবিরোধ চলছে। এ ছাড়া ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে পরাজয়ের পর অনিয়মের অভিযোগে জামায়াত জোরালো অবস্থান না নেওয়ায় এনসিপির মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
এনসিপি ও জামায়াতের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দুই দলের দূরত্বের সূত্রপাত গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি। সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে আসন সমঝোতার আলোচনায় এনসিপি অন্তত তিনটি সিটিতে ছাড় চেয়েছিল। বিশেষ করে ঢাকার দুই সিটির অন্তত একটিতে প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে অনড় ছিল দলটি।
অন্যদিকে জামায়াত ঢাকার কোনো সিটিতেই শরিকদের ছাড় দিতে রাজি হয়নি। এর পরিবর্তে কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ সিটিতে এনসিপিকে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব দেয় দলটি। তবে এনসিপি সেই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। একপর্যায়ে বৈঠক থেকে বেরিয়ে যায় দলটির নেতারা।
দুই দলের নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর থেকেই সম্পর্কে শিথিলতা তৈরি হয়। গত এক মাসে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকেও অংশ নেননি নাহিদ ইসলাম।
গত ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করেও দুই দলের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ে বলে জানা গেছে।
ওই নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থীর পরাজয়ের পর অনিয়মের অভিযোগে দলটির জোরালো প্রতিবাদ না করাকে ভালোভাবে নেয়নি এনসিপি। এ ছাড়া বিএনপির বিজয়ী প্রার্থীর কাছ থেকে পরাজিত জামায়াত প্রার্থীর হাসিমুখে মিষ্টি খাওয়ার ঘটনাও এনসিপির নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে।
এ নিয়ে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) শাহবাগে এনসিপির গণবিক্ষোভ কর্মসূচিতে তীব্র প্রতিবাদ জানান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
তবে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার বিষয়টি সরাসরি মানতে নারাজ এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন।
সম্প্রতি একটি সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, দুই দলের সম্পর্ক খারাপ যাচ্ছে—এমন কিছু নয়। তাঁর ভাষায়, একটি দলের সঙ্গে আরেকটি দলের সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মতো ভালো বা খারাপ হওয়ার বিষয় নয়। প্রত্যেক দলের নিজস্ব কিছু এজেন্ডা থাকে, যেখানে পারস্পরিক ঐক্য তৈরি হয়।
মনিরা শারমিন আরও বলেন, জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির কোনো আদর্শিক জোট নেই। নির্বাচনী ঐক্যের ভিত্তিতেই ১১ দলীয় জোট গঠিত হয়েছে। তাই জোটের কর্মসূচির পাশাপাশি এনসিপি নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচিও পালন করছে।
সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, আসন সমঝোতা এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ নিয়ে দুই দলের মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। তবে এনসিপি আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ছাড়ার কোনো ঘোষণা দেয়নি।